Fune wo Amu – শব্দ, নীরবতা

ক্রমাগত সময়ের সাথে সাথে একই শব্দের জন্য পুরনো অর্থকে হঠিয়ে দিয়ে জায়গা করে নেয় নতুন অর্থ। একটা শব্দের পর আরেকটা বসানো হয় – গল্প, কবিতা, গানে, রূপকে – আবার নিজেই নতুন কোন অর্থ বানিয়ে বসি। শব্দ তো জীবন্ত!

Advertisements

এই যে আমরা প্রতিনিয়ত যেসব অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ভেতর দিয়ে যাচ্ছি – চিন্তাভাবনাগুলো – ব্যক্তিগত, অপরিচিত অথবা সামগ্রিক, পরিচিত, সবসময়ই একটা চেষ্টা থাকে সেগুলোকে একটা বস্তুগত রূপ দেওয়ার, অপরকে জানাতে  অথবা কেবল নিজের জন্যই। আর তার থেকেই তো কত সুন্দর একটা জিনিসের উৎপত্তি, ভাষা – শব্দ! আমাদের চারপাশের সব বস্তু, ধারণা, অস্পৃশ্য চিন্তাভাবনাকে একটা একটা নাম দিয়ে দেই – তাদের সাথে স্ব-স্ব অর্থ জুড়ে দেই – কখনো একটার জন্যই একাধিক নাম, বা আবার একটা শব্দের জন্য একাধিক আলাদা আলাদা অর্থ! ক্রমাগত সময়ের সাথে সাথে একই শব্দের জন্য পুরনো অর্থকে হঠিয়ে দিয়ে জায়গা করে নেয় নতুন অর্থ। একটা শব্দের পর আরেকটা বসানো হয় – গল্প, কবিতা, গানে, রূপকে – আবার নিজেই নতুন কোন অর্থ বানিয়ে বসি। শব্দ তো জীবন্ত!

 

আচ্ছা, এখন ব্যাপারটা একটু ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে। শব্দের প্রথম লক্ষ্যই তো ছিলো মানুষে মানুষের সংযোগ তৈরী করা, সেখানে তা যদি এত বেশি ব্যক্তিগত হয়ে যায়, তাহলে তো পুরো চেষ্টাটাই বৃথা। তাই তো শব্দের এই লাগামছাড়া এই বিচরণে কিছুটা রাশ টেনে ধরতে বরং একজন শব্দসওয়ারের সামিল হওয়া হল – আমরা তার নাম দিয়ে দিলাম ডিকশনারী – জিশৌ – অভিধান। শব্দ ব্যবহারে একটা সংবিধান তৈরী করে দেওয়া হল। সাথে একটা পথ নতুন, নতুন, অজানা সব শব্দ জানার!

 

আমার মনে আছে ছোটবেলায় মাঝে মাঝেই আমি অভিধান খুলে পড়তাম। উদ্ভট একটা ব্যাপার হয়তো। লাইন ধরে ধরে না। র‍্যান্ডমলি কোন পৃষ্ঠা খুলে কোন একটা শব্দের উপর এসে পরা। কখনো একেবারে নতুন কোন বস্তু বা ধারণার সাথে পরিচিত হতাম, অথবা কখনো আবার পুরনো কিছু – কোন অনুভূতি বা অভিজ্ঞতা – যা হয়তো আগে বর্ণনা করার জন্য কোন উপায় জানা ছিলো না। মাজিমে এমন অভিধান খুলে খুলে শব্দ বের করে পরে না, কিন্তু শব্দ-বইয়ের প্রতি তার ভালোবাসা যে আরো অনেক বেশি গাঢ় – তা তার সাড়ে চার তাতামি ঘরের একোন ওকোন ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বইয়ের স্তুপের দিকে চোখ বোলালেই বোঝা যায়। সেদিক থেকে চিন্তা করলে তার চাকরীর জায়গাটা তো ছিলো একদম যথার্থ – প্রকাশনা সংস্থা! কিন্তু কাজটা যে সেলস ডিপার্টমেন্টে। এরচেয়ে বড় পরিহাস আর কী হতে পারে! অবশ্য নদীর পাড়ে থাকা অ্যাম্যুজমেন্ট পার্কের ফেরিস হুইলটার মত সময়ের চাকাও ঘুরতে শুরু করলো, যখন এই সংস্থারই অভিধান বিভাগ নতুন একটা প্রোজেক্টের কাজ হাতে নিলো। দাইতোকাই – The Great Passage – যা হবে আধুনিক জাপানের সেরা অভিধান। আর তাতে দৈবক্রমে এসে যুক্ত হলো মাজিমে!

 

এখান থেকেই তো Fune wo Amu-’র গল্প শুরু। অভিধান বানানোর গল্প। চার-পাঁচজন মানুষের বছরের পর বছর ছোট্ট একটা ঘরে বসে অভিধান বানানোর গল্প। শব্দ বাছাই করা, তা সম্পাদনা করা, কাগজ বাছাই, আর শেষে প্রকাশনা – এই তো। আচ্ছা, কাজটা এত সহজ নয়। বরং বলা যায় একটু বেশিই কঠিন, ধৈর্য্যের চরম পরীক্ষা নেওয়া। প্রথমত, অগণিত শব্দভান্ডার থেকে কয়েক হাজার শব্দ বাছাই মানে তারও অনেক বেশি গুণ শব্দ বাদ দিয়ে দেওয়া! এটার গুরুত্ব যে কত বিশাল তা কি চিন্তা করা যায়! একটা শব্দ বাদ দিয়ে দেওয়া মানে একটা সম্পূর্ণ জগৎ আর তার ধারণাকে বাদ দিয়ে দেওয়া। রাজনৈতিক, জাতিগত বা ধর্মীয় প্রোপাগান্ডায় শব্দই তো সবচেয়ে বড় অস্ত্র(1984!)। তারপর আবার শব্দগুলোর সাথে বসাতে হবে একেকটা সংজ্ঞা। অভিধান বানাতে যেখানে লাগে দশকের মত, সেখানে প্রথমে দেওয়া কোন অর্থ আমূল বদলে যেতে পারে।  তবুও শব্দের সাথে সখ্য গড়ে মাজিমের জন্য অভিধান বিভাগের ছোটরুম – সারি সারি শব্দের কাগজ – নিশিওকা, সাসাকি, মাৎসুমোতো আর আরাকি-সান – এবং অবশ্যই নীরবতার সাথে সেটাই ছিলো আদর্শ জীবন। আর রাতে এসে নিজের ঘরের বই আর বারান্দার চাঁদের সাথে সময় কাটানো।

 

কিন্তু সেই বইয়ের পাতা কিংবা চাঁদের দেশ থেকেই বিড়ালের মত নীরব পায়ে নেমে তার বারান্দায় এসে হাজির হলো কাগুয়া-হিমে! তোরা-সানকে কোলে যখন সে এসে দাঁড়ায়, বলে, “You came to get me?”, মাজিমে তখন খেই হারায়, মুখের ভাষাও! আরে, এই সময়টাতেই তো শব্দের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন! মাঝখানের এই বিশাল সমুদ্রটা পাড়ি দেওয়ার জন্য।

 

শব্দ – শব্দ – শব্দ – শব্দই তো মানুষের মধ্যে বন্ধন তৈরী করে, যেমন এখন হচ্ছে আমার আর আপনার মাঝে। সত্যিকার অর্থেই যদি কোন টেলিপ্যাথিক ক্ষমতা থেকে থাকে, তাহলে তা তো এটাই। এই যে আরেকজনের মাথার ভেতর ঢুকে যাওয়া, তাদের নিয়ে যাওয়া যেকোন মুহূর্তে, সময়কাল পেরিয়ে – নিশিওকার সেই পার্কের দোলনায় বসে থাকা দুপুরগুলোয়, মাজিমের প্রেমপত্র নিবেদনের রাত্রিতে, অথবা অনেক পরে এক শেষকৃত্যের পরে কোন চিঠি পড়ার সময়। শব্দ তো অতিক্রম করতে পারে মৃত্যুকেও!

 

মাজিমের মত Fune wo Amu শব্দকে ভালোবাসে। কিন্তু Fune wo Amu তার মানুষগুলোকেও ভুলে যায় না। বরং Fune wo Amu যতটা অভিধান বানানোর কাহিনী, ততটাই এর মানুষগুলোরও। আর নীরবতার। শব্দের প্রতি এর অকৃত্রিম ভালোবাসার পরও Fune wo Amu নীরব মূহুর্তগুলোকে ভুলে যায় না। বরং কেবল ছবি দিয়ে গল্প বলাতেও তা সিদ্ধহস্ত। তুষার, বৃষ্টি, বা ঝড়া পাতার সাথে সাথে মাস-ঋতূ-বছর গড়িয়ে যায় একে একে। আমরা সহযাত্রী হই নিশিওকা আর মিয়োশির, যখন তা দুইজন থেকে চারজনের গল্পে রূপ নেয়। আদি, অকৃত্রিম, একক অনুভূতিগুলো বর্ণনার জন্য তো সবসময় শব্দের দরকার হয় না। বরং নীরবতাই তো তাদের অর্থগুলোকে আরো জীবন্ত করে তোলে। তা হোক প্রথমবারের মত কারো সাথে ‘এনকাউন্টার’-এ, কিংবা হয়তোবা কারো সাথে শেষ বিদায়ে।

Cat Soup-এ মৃত্যু-ভাবনাঃ ভালোবাসা এবং অনিবার্যতা

এবং অনেকটা তার খামখেয়ালীপনার কারণেই চারিদিক পানিতে ভেসে যাওয়া জায়গাগুলোরই এখন ধুঁ ধুঁ মরুভূমি হওয়ার পালা। “নোয়া’স ফ্লাড” হয়েছে আর “জোসেফ’স ফেমাইন” হবে না?

Continue reading “Cat Soup-এ মৃত্যু-ভাবনাঃ ভালোবাসা এবং অনিবার্যতা”

Ping Pong the Animation – ব্যর্থতা, সংগ্রাম আর জীবনের শৈল্পিকতা

বারবার ব্যর্থতার কথা বললেও পিংপং দ্য অ্যানিমেশন শুধু নিরাশার গল্প না। বরং সম্পুর্ণ বিপরীত। বাস্তব ঘেঁষা, পতনের অনিবার্যতার কথা বলা; কিন্তু তা মেনে নিয়ে উত্তরনের, হার না মানার, এর সবটুকু উপভোগ করার বার্তাবাহী।

Continue reading “Ping Pong the Animation – ব্যর্থতা, সংগ্রাম আর জীবনের শৈল্পিকতা”

Shouwa Genroku-তে আত্নহত্যা, আর রাকুগোর মঞ্চায়ন

কিন্তু কেবল রাকুগোর নিখুঁত মঞ্চায়নই না, তার চেয়েও বেশি কিছু, Shouwa Genroku এক অনবদ্য সিনেমাও। সামনে থেকে না দেখতে পাওয়া পারফর্মারের দেহের অঙ্গভঙ্গিগুলো আমরা দেখি, পারফর্মারের পাশে বসে, আসলেই মিশে একাকার হই, শুধু রাকুগোগুলোর গল্পের সাথেই না, তার পেছনের মানুষটার গল্পগুলোতেও।

Continue reading “Shouwa Genroku-তে আত্নহত্যা, আর রাকুগোর মঞ্চায়ন”

Penguindrum-এ ট্রেনযাত্রাঃ হারানো দশক অথবা টোকিওর ত্রানকর্তা

Mawaru Penguindrum কোন বৈশ্বিক গল্প না, তা পুরোপুরি জাপানের ইতিহাসের উপর ভর করা, এর মানুষ আর তাদের অতীত, তাদের পরিস্থিতি, তাদের দূর্দশার মনোসমীক্ষণ।

Continue reading “Penguindrum-এ ট্রেনযাত্রাঃ হারানো দশক অথবা টোকিওর ত্রানকর্তা”

কন আর্ট – স্বপ্ন, বিভ্রম আর চলচ্চিত্রের প্রতি প্রেমপত্র

চলচ্চিত্র-প্রেমিক কনের প্রথম মুভিতেই তুলে আনলেন বিনোদন-জগতের অন্ধকার দিক। যদিও ঠিক সামাজিক-ভাষ্য প্রদান বা সমালোচনা কখনোই তার মূল উদ্দেশ্য ছিলো না। Perfect Blue নিয়ে কনের চিন্তাভাবনা, আর মূলচরিত্র মি্মা কিরিগোয়ের পতন নিয়ে বরং সমান্তরাল টানা যায় । গল্পে মিমা সাধারন এক পপ-আইডল থেকে যতই বিনোদন জগতের উপরের তলায় আরোহণ করতে থাকে – মানসিক আর শারীরিক বিভিন্ন ত্যাগ সহ্য করে – ততই তার কাছে চেতন আর অবচেতনের বিভেদ ভাঙ্গতে শুরু করে। তার আকাংক্ষিত স্বপ্নালোক বিভীষিকায় রুপ নেয়।

Continue reading “কন আর্ট – স্বপ্ন, বিভ্রম আর চলচ্চিত্রের প্রতি প্রেমপত্র”