শব্দ মিলানোর খেলা (সপ্তম প্রহর)

ফুটপাত জুড়ে বসানো দোকানে দোকানে

আগুনে জ্বলে পুড়তে থাকা কালো তেল;

অথবা আকাশের ফানুশ

আগের দিনের মতই; নতুন-পুরনো

গ্রাউন্ডহগ ডে’তে আটকা পরা মানুষ।

 

সেইসব সন্ধ্যারাতে ভাজাপোড়ার ঘ্রাণে

দূরদূরান্ত থেকে আসা বিদ্যুৎ প্রেতেরা

ফাকাগলি, ময়দান, তিন-চার রাস্তার

মোড়ে, কুপির তারে আগুন ধরায়

তাদের কিছু চেপে বসে আমার ঘাড়।

 

নতুন উজ্জ্বল সাদা বাতির তলায় ছায়া

পেছনে সামনে দুলতে থাকে

আবার সামনে-পেছনে, একসাথে কখনো

চারপাশ ছড়ানো বর্গের কর্ণের মত

আর আমার কর্ণ জাগ্রত নতুন কোন

গল্পের অপেক্ষায়।

 

ভ্যানগাড়ির উপর, স্তুপে, পুরনো, ছেঁড়া

বইয়ের শেষের পাতায় লেখা ছিলো

“শব্দ মিলানোর খেলা”; ফুলার রোডের বাঁকে।

তবুও মাথা থেকে ভিড় করা, কথাদের সারি

পাশের চার রাস্তার গাড়িদের মত

আটকে থাকে।

Advertisements

মে ২৫, ২০১৭

সন্ধ্যাবেলায় মাংসের দোকানের বাইরে
গলায় দড়ি বেঁধে আয়েশ করে বসা
সাদা ষাঁড়টার চোখের দিকে তাকিয়ে
আরেকটা সপ্তাহের মৃত্যু দেখতে পাই

জুন ২, ২০১৭

দুটো দিন, তবুও আবার
মাঝখানেতে হাওড় পাহাড়
পেরোয় যদি ভুত-ভবিষ্য
পদ্যবগির সারি-
এপথ ঘুরে, সেপথ ঘুরে
নাকের ডগায় ধুম্র মুড়ে
থামলো এসে সে স্টেশনেই
তো, ভাবনার রেলগাড়ি।

আমাদের সন্ধ্যারাতের গল্পগুলো

তার সাথে আমার পরিচয় ছিলো না।

 

পৈত্রিকসূত্রে যাওয়া সেলুনের বেঞ্চিতে যেবার অনেক ভিড় দেখলাম, সেবার যখন আমার বয়স আগের চেয়ে বেশি এবং আমার বিষন্নতা গুলো মাথার ভেতর শিকড় গজিয়ে সামনে চোখ আর কিনারায় কান পেরিয়ে নেমে এসেছে, আর তাতে বাসা বানানো কালো এক কাক সন্ধ্যার ঠিক আগে থেকে ভোর পর্যন্ত সেখানে বসত গাড়ে, আর সূর্যের সাথে সাথে সারাদিনের জন্য বেরিয়ে পরে, তাই আগে যেখানে কখনোই আমি নতুন কোন জায়গায় একা একা যেতে ইতস্তত করতাম, সেখানে তখন আমি প্রথমবারের মত বাজারের রাস্তা ধরে এগিয়ে আরো মিনিট পাঁচেক হাঁটা পথ দুরের সেলুনটায় গিয়ে বসলাম; সেখানেও খালি ছিলো না, তবে অপেক্ষমান মানুষের সারিতে আমিই প্রথম।

তার নামটাও আমার জানা ছিলো না। এখনও নেই। মাঝখানে কোন এক সময় জানা থাকলেও তা আবার ভুলে গেছি।

 

“কীর’ম কইরা কাটবেন?” সে জিজ্ঞেস করলো।

“কিনার দিয়া ছোট কইরা দেন। সামনে দিয়া বড় রাখবেন।”

 

সে আমার গলার চারপাশে সাদা কাপড় দিয়ে ফাঁস লাগায়, শক্ত আঁটুনিতে। আমি ফাঁসির দ্বন্দ্বপ্রাপ্ত আসামির মত নিয়তি মেনে নেই, ঢোক গিলি, সামনের কাঁচটায় নিজের চেহারার প্রতিবিম্ব দেখি, অথবা সামনের কাঁচটায় পেছনের কাঁচটার প্রতিবিম্বের ভেতর নিজের মাথার পেছনটার প্রতিবিম্ব দেখি। সে পাশের দোকান থেকে সিগারেট জ্বালিয়ে আনে। ডান হাতের আঙ্গুলের ফাঁকে ধরে, টান দিতে দিতে, অপর হাতে কাঁচি আটকে, আমার মাথার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছক কষে। তখন কার্বন-ডাই-অক্সাইডের টানে চলে আসা মশার মত, আশপাশ থেকে আরো কয়েকজন গল্পচোষা লোক সেখানে ভিড় জমায়। সিগারেটের ধোঁয়ার ৫৯৯টা উপাদানের মধ্যে মানুষকে আকৃষ্ট করার কী থাকে – আমি চিন্তা করি।

 

“ভাই, বিয়ার করার বয়স তো হইতাসে, মাইয়া দেইখা দেন।” তাদের মধ্যে যাদের বয়স কম তারা বলে।

আমি ধারণা করি সে হয়তো এ ব্যাপারে সিদ্ধহস্ত। নিয়মিতই মাথার চুল কাটার বিপরীতে সম্পর্কের জোড় লাগানোতেও পারদর্শী।

“মেয়ের কী অভাব আছে!” সিগারেট হাত বদল করতে করতে সে জবাব দেয়। সেটার ধোঁয়া আর বাইরের রাস্তা থেকে ভেসে আসা ধুলোর মাঝে আমার কাটা চুলগুলো ভাসতে ভাসতে নিচের মেঝেতে ছাইদের সাথে জমা হয়।

“কন কী! কে?” আমি কান খাড়া করি। আমার ভবিষ্যতে প্রয়োজন লাগলে এর কাছে আসাই যায়।

“কলিমুদ্দির বইনরে চিনো না?”

তারা মাথা নাড়ায়। মনে মনে আমিও।

“আরে জাইল্ল্যা পাড়ায় থাকে, কলিমুদ্দি। মাছের ব্যবসা করে। হ্যারে চেনো না!”

তারা আবার মাথা নাড়ায়। মনে মনে আমিও। বাসার বাজারের দায়িত্ব আমার উপর কখনো পরে না। মাঝে মাঝে টুকিটাকি জিনিস কিনতেই হয়তো মুদি দোকানে যাওয়া পরে। চালের দাম, ডালের দাম, অথবা ক্রমশ হ্রাস পাওয়া ইলিশ মাছের দামের খবর হয়তো আমার কাছে আছে, কিন্তু ভালো মাছ কিংবা তার ব্যাপারীকে চেনার মত দক্ষতা আমার এখনো জন্মায়নি।

“তয় সমস্যা হইলো একবার বিয়া হইসে।”

“তারপর কী হইলো?” তারা বিষ্মিত হয়।

“জামাই অন্য মাইয়ার লগে পালায় গেছে,” সে থামে, তাদের আগ্রহী চোখের দিকে তাকিয়ে আবহ জমায়, সিগারেটে ফুঁ দেয়, আমি কাঁচের প্রতিবিম্বে আড়চোখে তার চোখের দিকে তাকাই। “তবে পালাইসে যেই মাইয়ার লগে, সে হইলো আমিনার…আর কলিমুদ্দির চাস্তো বইন।”

আমরা অথবা কেবল আমি আমিনার দুর্দশার কথা চিন্তা করে দীর্ঘশ্বাস ফেলি। আমার গলার নিচে জমা হওয়া কাটা চুলগুলো সেই বাতাসে ছড়িয়ে পরে।

“চিন্তা কইরো না,” সে আশ্বাস দেয়। “মেয়ে চাকরী করে, নিজেই টাকা কামায়। ”

তখন আমরা অথবা তারা, না, কেবলই আমি আমিনার কথা ভেবে আনন্দিত হই।

“চিন্তা কইরো না, মামুন। তুমি তো ভালো পোলাই। মাইরের কারণে আগের বউ পালায় গেসে তো কী হইসে! কলিমুদ্দির কানে কথা লাগায় দিমু। ইনশাল্লাহ হইয়া যাবে।”

আমি আবার চিন্তিত হই। কপালের সামনের চুল কাটতে আসলে আমি চোখ বন্ধ করে ঘোরের মধ্যে চলে যাই। চোখ খোলার পর দেখি মানা করার সত্বেও সামনের চুল অনেকাংশে কেটে ফেলেছে। সে তখন আমার মুখ, কান আর ঘাড়ে পাউডার মেখে দেয়। গলার ফাঁস খোলার পর আয়নাতে ফ্যাকাশে চেহারায় নিজেকে আরো মৃত মনে হয়, চিনতে পারিনা। বাইরে বেরিয়ে জামা ঝাড়তে ঝাড়তে আমিনার কথা চিন্তা করি, তার পালিয়ে যাওয়া স্বামীর কথা, তার স্বামীর সাথে পালিয়ে যাওয়া তার চাচাতো বোনের কথা। তারপর আমার মাথায় বিকেলবেলার বাজি ফুটবল খেলার কথা ফিরে, সাথে আশ্রয় খোঁজা কাকটাও।

 

বাসায় ফেরার পথে মাথার মধ্যে কিছু একটা খচখচ করতেই থাকে, কাকটা না, অন্য কিছু। আমিনা – আমিনা – আমিনা – জাইল্ল্যা পাড়া – জাইল্ল্যা…তখন আমার মনে পড়ে – আমিনাবুর কথা। আরে আমিনাবুদের বাসাও জাইল্ল্যা পাড়ায় ছিলো না! তার বাবার বাসা। কিন্তু আমিনাবু থাকতো আমাদের এই নতুন পাড়ায়, এই রাস্তার একতলা যেই টিনশেডের বাসাটা, তার মামার বাসায় – যার পেছনে একটা খোলা বারান্দা আছে – ছিলো, যেইখানে ঝড়ের দিনে আম কুড়ানোর শেষে আমরা সব আম জড়ো করতাম, আর আমিনাবু আমাদের তা কেটে চিনি-মরিচ দিয়ে মাখিয়ে দিতো। সে তো মাংসচোর খেলাতেও ছিলো নিয়মিত বউ, আর সন্ধ্যাবেলার আসরের গল্পরানী।

 

সন্ধ্যার পর নিয়মিত বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সময়টায় আমরা যখন চাঁদ আর জোনাকির আলোতে বাইরে বেরিয়ে আসতাম, তখন আমিনাবুকে ঘিরে আমাদের ভিড় জমতো। খেলার মাঠের পাশের দুইফুট উঁচু দেওয়ালটায় সে বসতো। আর আমরা অর্ধবৃত্ত হয়ে তাকে ঘিরে থাকতাম নিচের ঘাসে। তখন আমিনাবু আমাদের গল্প বলতো – ভুতের গল্প। আমরা অধীর আগ্রহ নিয়ে প্রতিদিন শুনতাম, যদিও জানতাম সেদিন রাতে একাএকা আর বাথরুমে যেতে পারবো না, অথবা পর্দার ওপারে নড়তে থাকা নারিকেল গাছের ডালের ছায়া দেখে সোলেমান জ্বীনের বিশ ফুট লম্বা হাত ভেবে আঁতকে উঠবো। তবুও আমরা গল্প শুনতাম সম্মোহিতের মত।

 

আমিনাবু একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করে, “মাইদুল, বড় হইয়্যা কী করতে চাস?”

আমি অত্যুৎসাহী কন্ঠে বলি, “গল্প লিখতে চাই, ভূতের গল্প! তারপর তুমি আমার গল্প পইড়া শুনাইবা সবাইরে!” আমিনাবু হাসে, সেদিন রাতে ভাসতে থাকা এক ফালি চাঁদের মত। তারপর যখন গল্প শেষ হয়, বিদ্যুৎ চলে আসে, সন্ধ্যা আটটার সংবাদ শুরু হওয়ার ঠিক আগে আগে, তখন আমরা একে একে বাড়ি ফেরা শুরু করি – অসম্পূর্ণ বাড়ির কাজ শেষ করতে কিংবা মেঝেতে শুয়ে শনিবারের প্যাকেজ নাটক শুরু হওয়ার অপেক্ষা করতে করতে না খেয়েই ঘুময়ে যেতে। কিন্তু আমিনাবু বসে থাকতো আরো কিছুক্ষণ, মাঠের ঘাসগুলো আবার মাথা তুলে দাঁড়াতেই তার পাশে এসে বসতো আজিজ ভাই। তাকেও সে গল্প শোনাতো হয়তো, ভূতের বা অন্য কিছুর। একদিন আমি দূর থেকে আড়ি পেতে শুনি, সে গানও শুনাচ্ছে – “আমি শুনেছি সেদিন তুমি…”। আমার অনেক রাগ হয়, কিন্তু তার গল্পের মত গানও আমাকে সম্মোহিত করে রাখে। আমিনাবুর উপর রাগ করা যায় নাকি!

 

আজিজ ভাই মারা গেলো গতমাসে। কলেজ পাশের পর অনেকদিন কিছু করেনি। আমাদের সাথে মাঝেমধ্যেই বিকেলবেলা ক্রিকেট খেলতো। তখন আমরা হাইস্কুলে পড়ি, আর নতুন নতুন সব বিদ্যুৎ পাওয়ার প্ল্যান্ট বসানো শুরু হয়েছে – রাতে বিদ্যুৎ যায় না। আমিনাবুও আমাদের গল্প শোনাতে বের হয় না। আর এলাকার সব আম গাছগুলোর বাগানে বিল্ডিং বানানো শুরু হয়েছে। তারপর একদিন হঠাৎ শুনলাম আমিনাবুর নাকি বিয়ে হয়ে গেছে, জাইল্ল্যা পাড়াতেই, তাদের নিজেদের এলাকায়। আমরা অনেকদিন আজিজ ভাইয়ের খবর পেলাম না। পরে জানতে পারলাম তিনি নাকি হাইওয়ে ট্রাকের ড্রাইভারের চাকরি পেয়েছেন, বাসায় আসেন খুব কম। সেটাও তো প্রায় ৬বছর আগের কথা!

 

সেলুন থেকে বের হয়ে আসার সময় আমার আবার মনে হয় ফিরে যাই, তাকে জিজ্ঞেস করি, এ আসলেই আমাদের আমিনাবু কিনা। আমিনাবুর কি কোন ভাই ছিলো? আমি মনে করার চেষ্টা করতে করি। তার ভাই কি মাছের ব্যবসা করতো? এগারো বছরের আমি এই আমাকে কোন সাহায্য করতে পারে না

 

তারপর বেশ কয়েকদিন যতবারই আমিনাবুদের বাসা – তার মামার বাসা – পার হতাম রাস্তা দিয়ে, আমার চোখ আঁতিউতি করে খোঁজ করে, তাদের বাসাটা এখন দোতলা বিল্ডিং। নিচে রাস্তার দিকে মুখ করা দরজার সামনে তিন ধাপের একটা সিঁড়ি। উপরতলায় বারান্দা – অর্ধেকটা গ্রিল ছাড়া। একদিন দুপুরবেলা চোখ উপরে উঠতেই আমার হৃদপিন্ড কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে যায়। আমিনাবু – আমিনাবুই তো – ঐ যে বারান্দায়, কোলে ছোট একটা বাচ্চা নিয়ে দাঁড়ানো। আমার দিকে কি তাকায়, আমাকে কি চিনতে পারে, আমাকে চিনতে পারার কথা না। আমি বাসায় এসে ব্যাপারটা সম্পর্কে নিশ্চিত হই, যখন মা বাবাকে বলে, “শুনসো, আমিনার জামাই নাকি পালায় গেসে?” তার ভাঙনধরা সংসার নিয়ে আমার দুঃখ পাওয়া উচিৎ, নাকি সে আবার ফিরে আসায় খুশি হওয়া উচিৎ, আমি দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগি। সে কি আজিজ ভাইয়ের খবর জানে?

 

গতমাসে একদিন শুনি আজিজ ভাই নাকি নিখোঁজ, উত্তরে কোন ট্রিপ ছিলো। এই ব্যাপারটা না ঘটলে হয়তো তার কথা মনেও পড়তো না। অবশ্য দু’দিন পরই ব্যাপারটা ভুলে গেলাম। চার-পাঁচদিন পর আবার মনে করিয়ে দেওয়া হলো। একদিন রাতে ভাত খাওয়ার সময় হঠাৎ চিৎকার চেঁচামেচি শুনে তাদের বাসায় গিয়ে দেখি তার মা আর খালার আহাজারি। গাজীপুরের বনে নাকি পাওয়া গেছে লাশ – ক্ষতবিক্ষত, চেনা যায় না। দুইদিন পর পুলিশ আর আর্মির গাড়ি করে এলাকায় নিয়ে আসা হলো তা – মানুষের ভিড় চারিদিক – কী হুলুস্থুল কান্ড! অনেককে লাশ দেখতে গেলো, তারপর এসে হরহর করে বমি করে দিলো। আমিনাবুর ভৌতিক গল্পের লোভ সামলাতে না পারলেও – আজিজ ভাইকে শেষবারের মত দেখতে যাওয়ার সাহস আমি করতে পারলাম না।

 

এরপরের এক সপ্তাহ আমি কারণে অকারণে আমিনাবুদের বাসা – তার মামার বাসার সামনে দিয়ে হেঁটে যাই। বারান্দায় তার আর সাক্ষাত মিলে না। মামুন হারামজাদার সাথে যদি তার বিয়ে হয়ে যায়!

 

তারপর একদিন সন্ধ্যারাতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর যখন আমার বিষন্নতাগুলো তেলাপোকার মত অন্ধকারে মাথা চাড়া দিয়ে বের হতে শুরু করলো তখন আমি মোমবাতি কেনার জন্য বাইরে বেরোলাম। এখনকার সন্ধ্যাগুলোতে বিদ্যুৎ চলে গেলেও বাড়িগুলোতে সাদা আলো দেখা যায়। আর রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো স্কন্ধকাটা কিংবা সোলায়মান জ্বীনের কথা কেউ মনে রাখে না। কিন্তু আমি ফাঁকা রাস্তার মাঝে চাঁদের আলোয় আমিনাবু – তার মামার বাসার বাইরের দরজার সামনের তিনধাপ সিঁড়িতে কাউকে বসে থাকতে দেখি।

 

আমি ধীর ধীরে পাশ কাটাতে যাই, তখন পেছন থেকে কেউ ডাক দেয়, “এই, মাইদুল, কই যাস?”

আমি অবাক হয়ে ঘাড় ঘুড়াই, আমিনাবুই তো, “চিনতে পারসেন?”

“আরে চিনবো না তোরে। তোর মত ডাইন হাত শরীলের লগে আটকায়া আর কে কাউরে হাঁটতে দেখি নাই জীবনে! হাতে কী?”

“মোমবাতি,” আমি হাত দেখাই।

“জ্বালা তো। তোরে ভালোমতো দেখি।”

আমি প্যাকেট থেকে একটা মোমবাতি বের করি। তারপর ইতঃস্তত করে প্যান্টের পেছনের পকেট থেকে গ্যাসলাইটটা বের করে তাতে আগুন ধরাই। কী মনে করলো কে জানে!

সে আমার হাত থেকে মোমবাতিটা কেড়ে নিয়ে আমার মুখের চারিদিকে ঘুরায়, “চুল এত বড় রাখসোস কেন?” আমি জবাব দেই না।

“কী করস এখন?”

“কলেজ পাশ করসি।”

“কী নিয়া পড়স?”

“কমার্সে।”

“আয়হায়! চাকরী করবি? গল্প লেখার কী খবর?” সে হাসে।

“তোমার মনে আছে?”

“মনে থাকবো না কেন?” সে এবার হো হো করে হাসে।

“তোর ভূতের গল্প পইড়া শুনানোর লেইগাই তো এখনো বাঁইচা আছি।”

আমি মোমের আলোর ওপাশে তার চেহারার দিকে তাকাই, ভাঙা চোয়াল, ভাঁজ পড়া চামড়া, বয়স কত – পঁয়ত্রিশ, ছত্রিশ। আমার গল্প তো তার বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ হতে পারে না।

“ফাহাদ, তারেক, আসাদের কী খবর?”

আমি জবাব দিতে পারিনা। আসলেই তো! আমার জীবন থেকে আমিনাবু, খেলার মাঠ, ভূতের গল্প, জোনাকিপোকা, ঘাসফুল আর আজিজ ভাইয়ের মত তারাও তো হারিয়ে গেছে! একই এলাকাতেই না থাকি! একই রাস্তা দিয়েই তো হাঁটাচলা করি!

 

এইখানে সিঁড়ির ধাপে একহাত ব্যবধানে বসে আমার আমিনাবুর কাছ থেকে অনেক কিছু জানতে ইচ্ছা হয়। অনেক গল্প শুনতে ইচ্ছা হয় – শুধু ভূতের গল্পই না! ভূতের গল্প শোনার জন্য তো মাঠটা দরকার। কিন্তু সেখানে এখন কালো পানি আর পাশের বাসার আবর্জনার স্তূপ জমা। অনেক নিচে কাঁদামাটিতে ঘাসও জন্মায় না হয়তো আর। আর তাই আমিও একুশে ফেব্রুয়ারিতে কাদামাটিতে বানানো গোল স্তবকে ঘাসফুল লাগিয়ে নারিকেল শলার তৈরি শহীদ মিনারের সামনে বসাই না।

 

এরচেয়ে এই সিঁড়ির ধাপে বসে সে নাহয় আমাকে সেইসব গল্পই শোনাক, যা সে শোনাতো আজিজ ভাইকে, অথবা কোন গান। কিন্তু আমি কিছু জিজ্ঞেস করতে পারিনা। চুপচাপ বসে থাকি অনেকক্ষণ। “আমাগো জীবনটা এমন হইয়্যা গেলো ক্যান, মাইদুল?” হঠাৎ সে বলে উঠে। আমি জবাব দিতে পারিনা। “এত কম কথা কইলে গল্প লিখবি কেমনে?” আমি হাসি। মাথার ভেতর এর উত্তর সাজাতে থাকি, তখন উপর থেকে ডাক আসে, “এই আমিনা, কার লগে কথা কস? বাবুর ঘুম ভাইঙ্গা গেসে গরমে, উপরে আয়, কাঁনতাসে।” আমিনাবু আমার হাতে মোমবাতি ফেরত দিয়ে দ্রুত উপরে চলে যায়। আমার তার কোন গল্প-গান শোনা হয় না, অথবা বলা হয় না মামুনের কুকীর্তির কথা।

 

আমি বাড়ি ফিরতে নেই, এসময় বিদ্যুৎ চলে আসে। আমি অপেক্ষা করি এক মুহূর্ত, তারপর উলটো দিকে হাঁটা দিই। তিনরাস্তার মোড়ের কে জানি কোন ভূত আমার ঘাড়ে চেপে বসে। এই রাত নয়টা বাজেও ব্যস্ত, কোলাহলময় বাজারে সেলুনের ভেতর গিয়ে ঢুকি। দেখি ভেতরে কেউ নেই। ঘুরানো চেয়ারের উপর সুন্দর করে বিছানো সাদা কাপড়টা তুলে নেই। মাথার ভেতর ছক কষি। কীভাবে শুরু করা যায়? যার নামটা আমার জানা নেই, ছিলো না, অথবা কোন একসময় জানলেও এখন ভুলে গেছি – আমি তার অপেক্ষা করি। ব্যাটা, মানুষের গলায় ফাঁস আটকাও, এবার তোমারটা আমি বাঁধবো! নাপিতগিরি ছেড়ে খুব ঘটকের ব্যবসা শুরু করেছো!

 

আমি তাকে আসতে দেখি, কাঁচের স্লাইডিং দরজা ঠেলে সে ভেতরে ঢুকে, হাতে সিগারেট নিয়ে। হাসি মুখে জিজ্ঞেস করে, “চুল কাটাইবেন?” আমি অপ্রস্তুত হয়ে যাই। দ্রুত হাতে ধরা কাপড়টা নামিয়ে রাখি চেয়ারের হাতলে। বাইরে চলতে থাকা গাড়ির হেডলাইটের ভেতরে জোনাকি পোকারা উড়তে থাকে, পাশের মাংসের দোকান থেকে গরুদের খাওয়া সব ঘাসফুলের গন্ধ ভেসে আসে, আর আমার মাথার ভেতর বসত গাড়া কাকটা একটানা কা-কা – করা শুরু করে। তাকে বাসা ছাড়া করা উচিৎ!

 

” না, না,” আমি মাথা নাড়াই। “আমার বিষন্নতাগুলা কাইটা দিতে পারবেন? চারিদিক সমান, একেবারে ছোট কইরা।”