মরে যাওয়ার গল্প

যখন তুমি আমার দিকে তাকালে, এবং হাসলে, তখন আমি জানালার মরচে পরা গ্রিলের ফাঁক গলে উড়ে যেতে থাকলাম

Advertisements

 

যখন তুমি আমার দিকে তাকালে, এবং হাসলে, তখন আমি জানালার মরচে পরা গ্রিলের ফাঁক গলে উড়ে যেতে থাকলাম, বেলুনের মত; গাছ-কয়টার মাথা, তারপর পাখিদের দল, শীতের থেকে বাঁচতে দেশভ্রমনে বেড়োনো প্রজাপতির দল, যার কিছু আমার মুখ গলে পেটের ভেতর ঢুকে গেলো আর নাচতে থাকলো, আরো পরে প্রথম মেঘ পার হয়ে, দ্বিতীয় মেঘ পার হয়ে, তৃতীয়, চতুর্থ…নবম মেঘে পৌছলে যখন আমার শীত করতে শুরু করলো, অথবা অন্য কোন কারণে, হয়তো শিরদাঁড়া বেয়ে সাপের মত কিছু একটা এঁকেবেঁকে চলে যাওয়ায়, হয়তো অভিকর্ষকে প্রতিক্ষান করা আমার এই যাত্রা সমত্বরণে ছিলো না বলে, আমার শরীরটা ঝাঁকি দিয়ে উঠলো, আর আমি শতশত মৃত, ভাঙ্গা, সময়ের স্রোতে ভাসতে থাকা উপগ্রহের সৈকতে, হঠাৎ চারিদিক অন্ধকার হয়ে যেতে থাকা দিগন্তের দিকে তাকিয়ে, প্রথম সেই ধুমকেত মুখোমুখি হলাম, কিছুক্ষন হতবিহবল হয়ে চেয়ে থাকলাম, আর যখন দক্ষিণে নিউজিল্যান্ড কিংবা সামোয়ায়  উঠা দিনের শেষ সূর্যের আলো আমার চোখটা ধাঁধিয়ে দিলো, আর একা একাই হাতটা চোখকে ঢাকতে উঠে আসলো, তারপর আলোর পেছনের অন্ধকার থেকে পরিচালক চেঁচিয়ে উঠলো, “লাইট, ক্যামেরা…অ্যাকশন!”, আর আমি স্টুডিওর চেয়ারে বসে কিছুক্ষন চুপচাপ আমার দিকে ছোড়া প্রশ্নটার মর্মাথ বোঝার ব্যর্থ চেষ্টা করতে থাকলাম, “আপনার যাত্রা কেমন হলো?”, আসলেই কেমন হলো, তা বোঝার আগেই আমি আমতা আমতা করে ধুমকেতুর কথাটা জানালাম, সাথে সাথেই আলোর পেছনে পরিচালক এবং তার পেছনে গ্যালারীতে বসা দর্শকদের কোলাহল কানে এসে পৌছলো, আমি ঘামতে থাকলাম, চাপে পরলে আমি ঘামতে থাকি, অনেক মানুষের আকর্ষনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও, অথবা শুধু একজনের, কথাগুলো গলায় আটকে যায়, উলটাপালটা বকি, আমি তাই কফি-টেবিলে থাকা কাপটা তুলে নিয়ে, নিজের সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে জমে শক্ত হয়ে থাকা শব্দগুলো ভেজাতে এক চুমুক চা গলায় ঢাললাম, তখন টিভির পর্দায় মায়ানদের দেখালো, দলবেঁধে আত্নহত্যা করা সারি সারি লাশ, সুন্দর নকশা করে সাজানো, নিচে ডান কোনে স্ক্রোল হওয়া সংবাদের পাশে আজকের সময় আর তারিখটা না থাকলে আমি বর্তমান নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়তাম, ২০১২ ভেবে ভুল করে, কারণ সেসময়টায় অ্যাপোকালিপ্স নিয়ে লেখা কল্প-বিজ্ঞান আমার খুব ভালো লাগতো, সুদুর গ্রহ নক্ষত্রে যাত্রা, বেঁচে থাকা কেবল শেষ দুই নর-নারী, কিংবা এখনকার মত মাটির তলে চলে যাওয়া মানুষ, অনাগত প্রলয়ের ভয়ে, হ্যালির ধুমকেতু ৭৫ বছর পর পর আসে, আমি জানি, ছোটবেলায়, খুব ছোটবেলায় যখন প্রথমবারের মত বইমেলায় গিয়েছিলাম, তখন কেনা বইয়ে তা নিয়ে একটা গল্প ছিলো, পিঁপড়ার মত মাটির নিচে আশ্রয় নেওয়া মানুষের গল্প ছিলো, এডমন্ড হ্যালির নামে দেওয়া ধুমকেতুর গল্প ছিলো, আমার নামে দেওয়া ধুমকেতু কত বছর আগে এসেছিলো, কত বছর পর পর আসবে, তা নিয়ে বড়সড় একটা বিজ্ঞান সমাবেশ হয়ে গেলো, আর আমি জ্যোতির্জ্যামিতির সূত্র জানতাম বলে সারারাত ধরে অংক কষে তা বের করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু পরীক্ষার ফলাফল যখন টানিয়ে দেওয়া হলো, দেখা গেলো আমার নামের পাশে বিশাল বড় একটা শূন্য, কারণ আমি মাঝে মাঝেই জ্যামিতির স্পর্শের সাথে তোমার স্পর্শ গুলিয়ে ফেলতাম, তাই শেষ পর্যন্ত ধুমকেতুটা পৃথিবীর পাশ কাটিয়ে চলে গেলো, যদিও ততক্ষনে নাসা আমার সমীকরণ টুকে নিয়ে পরমাণু বোমা ছুঁড়ে দিয়েছে, আর তারপর তা দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় আছড়ে পরলো, একে একে মানুষ মরলো, লাখ, নিযুত, কোটি, ভুজ আর ভুমির মুলবিন্দু দিয়ে বের হওয়া পুজের মত আগ্নেয়গিরি, উপরে ঢেকে দেওয়া বিষাক্ত, তেজষ্ক্রিয় মেঘ, সূর্যটাকে গ্রাস করা, অনেক আগে দেখা ডিসকোভারি চ্যানেলের কিউরিয়াসিটি অনুষ্ঠানের সেই পর্বটার মত, আর আমার কিউরিয়াসিটি কেবল তোমাকে নিয়েই ছিলো, তাই একে একে সবাই মরতে থাকলো, চারিদিক অন্ধকার হওয়া পৃথিবীতে, কেউ নেই, কেউ নেই, আর তখন, যখন তুমি আমার দিকে তাকালে, এবং হাসলে, আর আমার দাঁড়াতে কষ্ট হচ্ছিলো ব্রক্ষ্মপুত্রের উপর দিয়ে বইতে থাকা প্রচন্ড গরম, উত্তপ্ত লাভার উপর, আর মুখটা লাল হয়ে গিয়েছিলো গলন তাপমাত্রায় পৌছানো লোহার মত, আর তুমি কিছু বললে, যদিও তা আমার কানে পৌছলো না, কারণ তখন বায়ুমন্ডল পৃথিবী ছেড়ে মহাকাশে পারি জমিয়েছে, আর আমি জানি শব্দ সঞ্চালনের জন্য মাধ্যম দরকার, কিন্তু অনুভূতি কিংবা ভাবনা সঞ্চালনের জন্য আর কিছুর প্রয়োজন ছিলো না, তাই আমি সেই অন্ধকারে তোমার দিকে তাকিয়ে ছিলাম আর মাথার মধ্যে হিসেব কষছিলাম, আরো কত বছর, হয়তো শতাব্দী, সহস্রক পর আমার ধুমকেতু আবার ফেরত আসবে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s