রয় অ্যান্ডারসনের লিভিং ট্রিলজি – জীবন আর বিষন্নতার সৌন্দর্য

সুরা-বাস্তবতা আবেশ করা এক পরিবেশ, যেখানে অতীত আর বর্তমানের সুইডেনের যোগসূত্র ঘটে রয় অ্যান্ডারসনের চিরাচরিত ক্রূর রসিকতায় আর সুইডেনের ইতিহাসের ব্যাঙ্গাত্নক উপস্থাপনায়।

Advertisements

রয় অ্যান্ডারসনের চলচ্চিত্রের কথা চিন্তা করলেই প্রথম যে দৃশ্যটার কথা মনে পড়ে তা “A Pigeon Sat on a Branch Reflecing on Existence”-এর মাঝখানের দিকের; প্রায় দশ মিনিট দীর্ঘ আর তার আর সব শটের মতই এক টেক-এ নেওয়া। একবিংশ শতাব্দীর কোন এক বার-এর কোণে ক্যামেরা বসানো, লং ডিসট্যান্স শট; যাতে পুরো ঘরটা দেখা যায়, দরজার বাইরের রাস্তাটাও। আমরা সুইডেনের সপ্তদশ শতাব্দীর সৈন্যদের পোলিশ-সুইডিশ যুদ্ধের প্রাক্কালে দেখি, সারি বেধে মার্চ করতে করতে যাওয়া, তাদের নির্মমতার প্রকাশ দেখি, আবার দুই শট পর তাদের প্রত্যাবর্তনও দেখি; বিধ্বস্ত, পরাজয়ের পর। এই একটি শটই  “লিভিং ট্রিলজি”-’র মূল উপজীব্যগুলোর বাহক, থিমেটিক দিক দিয়েও, অ্যাস্থেটিক দিক দিয়েও। সুরা-বাস্তবতা আবেশ করা এক পরিবেশ, যেখানে অতীত আর বর্তমানের সুইডেনের যোগসূত্র ঘটে রয় অ্যান্ডারসনের চিরাচরিত ক্রূর রসিকতায় আর সুইডেনের ইতিহাসের ব্যাঙ্গাত্নক উপস্থাপনায়।

 

রয় অ্যান্ডারসনের বড় পর্দায় শুরুটা ষাটের দশকেই, প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি ১৯৭০-এ। কিন্তু ১৯৭৫ এর “Giliap”-এর পর তিনি চলে গেলেন সিকি শতাব্দীর বিরতিতে। ২০০০-এ তার প্রত্যাবর্তন লিভিং ট্রিলজির প্রথম চলচ্চিত্র “Song From the Second Floor” দিয়ে; এরপর দুইবার সাত-সাত বছরের ব্যবধানে বেরোলো বাকি দুই অংশঃ  ২০০৭ এ “You, the Living”, আর ২০১৪ তে “A Pigeon Sat on a Branch Reflecting on Existence”। তিনটিই চলচ্চিত্রই গতানুগতিক চলচ্চিত্রের গাঠনিকতা থেকে মুক্ত – কোন সুনির্দিষ্ট কাহিনী ধরে এগোয় না, একগাদা স্লাইস-অফ-লাইফ ভিনিয়েটের সমাহার, বারবার ঘুরে-ফিরে আসা অনেক চরিত্রই আছে, কিন্তু কাউকে মূলচরিত্রের কাতারে ফেলা যায় না। রয় অ্যান্ডারসনের শট কম্পোজিশনও স্বাতন্ত্রিক। তিনি তার ক্যামেরা বসিয়ে দেন, সেটের এক কোণে, (দু-একটি ব্যতীক্রম বাদে) সর্বদা অনড়, মিডল-লং ডিসট্যান্স শট, যাতে সব চরিত্রদের দেখা যায় একসাথে, একসময়, সবসময় – মাল্টিলেয়ারড; আর সব নেওয়া এক টেক-এ – কয়েক সেকেন্ড থেকে যা এমনকি পনের-বিশ মিনিট পর্যন্তও লম্বা, নাটকের অংকের মত। কেবল নাটকের মত উপস্থাপনাতেই না, অভিনয় নির্দেশনাতেও মঞ্চের সাথে একটা সমান্তরাল টানা যায় – তাতে কেমন একটা জড়তা লেগে থাকা, কখনো অতিনাটুকে আবার কখনো ডেডপ্যান এক্সপ্রেশন – দুই এক্সট্রিমের ব্যবহার। আমরা চরিত্রগুলোকে খুঁজে পাই জীবনের মান্ডেন আর ব্যক্তিগত সব মূহুর্তে, একাকীত্বে আর বিষন্নতায়, কোন মনোলোগ ছাড়া, অধিকাংশ সময় খুব কম সংলাপের ব্যবহারে। কেবল শটের কৌশলগত  দিক থেকেই না, ইমোশনাল দিক থেকেও রয় অ্যান্ডারসন তার দর্শকদের একটা দূরত্বে রেখে দেন। আর আমরা সবকিছু দূর থেকে অবলোকন করি, অবজেক্টিভলী, জীবন আর অস্তিত্বের কারণ অনুধাবনের প্রচেষ্টায়, ওমনিপ্রেজেন্স নিয়ে, ত্রিকালদর্শী কোন পায়রার মত যেন।

 

অ্যান্ডারসনের মূলশক্তি তার ওয়ার্ডপ্লে, পানের ব্যবহারে।  “Song From the Second Floor”-এর মাঝখানে এক চরিত্র যখন উক্তি করে, “I have burnt my business to ground.”, সাধারন ক্ষেত্রে প্রথমে একে ফিগারেটিভ মনে হলেও, তার পরবর্তীতে দৃশ্যেই আমরা দেখি আসলেই সে তার দোকানকে পুরিয়ে ছাইয়ে পরিণত করেছে। আর আছে তার ডার্ক হিউমার, যা স্টোকহোমের পিচঢালা রাস্তার চেয়েও কালো। “A Pigeon Sat on a Branch Reflecting on Existence”-এর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের সেই দৃশ্য, যাতে একদল মানুষকে চারপাশ ট্রাম্পেট লাগানো এক বিশাল সিলিন্ডারে ঢোকানো হয়, আর তারপর নিচে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। ভেতরের মানুষের ছোটাছুটিতে সিলিন্ডার তার অক্ষের সাথে সরল দোলনে দুলতে থাকে, ভেতরের মানুষের চিৎকার ট্রাম্পেটের নিনাদে তৈরী করে সংগীতের মূর্ছনা। তারপর ধীরে ধীরে দোলন কোণ কমতে থাকে, শব্দের তীব্রতাও।  মেথোডিকাল, পিচ-পার্ফেক্ট। গা শিউরে দেওয়া।

 

স্লাইস-অফ-লাইফের এই আলাদা সব “স্লাইস”-গুলো অ্যান্ডারসন যুক্ত করেছেন সাহিত্যের মাধুর্য্যে, কাব্যিকতায়, স্ট্রিম অফ কনশাসনেস দিয়ে। কোন দৃশ্যের  ব্যাকগ্রাউন্ডে চলতে থাকা মিউজিক পরবর্তী দৃশ্যে পরিণত হয় বাদকদের সেই বাজনা বাজানোর দৃশ্যেতেই। সুরা-বাস্তবতার ব্যাকরণের নিয়ম মেনেই স্টোকহোমের রাস্তায় অনন্তকালব্যাপী চলা এক জ্যাম লেগে যায়, ২০০ বছরের পুরোনো এক প্লেট ভাঙ্গার দায়ে বিচারকেরা বিয়া্রের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে মৃত্যুদ্বন্দ্বের রায় দেন, এক কিশোরীকে বলি দেওয়া হয় শেয়ার বাজার ধ্বস থেকে প্রতিত্রাণ পাওয়ার শেষ প্রচেষ্টা হিসেবে, ট্রেন স্টেশনে ভূতেদের আগমন ঘটে। আর প্রতিটি চলচ্চিত্রেই তাড়া করে বেড়ায় সুইডেনের অতীত আর বর্তমানের ভূতেরাও – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, অর্থনৈতিক মন্দা, দূর্নীতি।

 

“A Pigeon Sat on a Branch Reflecting on Existence”-এর এক দৃশ্যে গল্পের চরিত্র জোনাথান নিজেকে চরম দুঃখ ভারাক্রান্ত অবস্থায় আবিষ্কার করে, বারবার একটি গান শুনতে থাকায়, যাকে সে বর্ণনা করে, “beautiful and horribly sad”। রয় অ্যান্ডারসনের গল্পের আর সব চরিত্রদের মত, তাদের সবার জীবনের মত, তাদের সবার অস্তিত্বের মত। অ্যান্ডারসনের গল্পের চতুর রসাত্নকতা হাসির সুযোগ দেবে অনেক জায়গাতেই – বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার চরিত্রদের দূর্দশার প্রেক্ষিতে, তাদের একাকীত্ব আর বিষন্নতায় – নিজেদের সাথে মিল খুঁজে পাওয়াতে।  কারণ জীয়ন-ত্রয়ীর চরিত্রদের গল্পগুলো যে কারো সাথেই রিলেটেবল – স্থান-কাল আর পাত্র নিরপেক্ষ – বাস্তব আর জীবন্ত, সুন্দর আর ভয়ঙ্কর বিষাদময়।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s