ভুভুজেলা, চেকোস্লোভাকিয়া কিংবা বাঁশেরপুলের ইতিহাস

একদিন রাতে তিনি শুয়ে শুয়ে স্মৃতির পাহাড় খুঁড়ে এই উক্তির অতীত বের করার চেষ্টা চালান এবং সেটাই হয় তার সেদিনকার ঘুমকে উপেক্ষার কৌশল। যথারীতিই এ রহস্য উদ্ধারের আগেই তিনি ঘুমিয়ে পরেন, এবং সকালে বিষয়টা বেমালুম ভুলে যান। আরো অনেকদিনের জন্য। কারণ মীর কাশেম ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন, ভূতত্বের না। আর বাকি বেশিরভাগ দিন তিনি মিনিট দুয়েক চোখ বন্ধ করে দিনের ঘটনাগুলো মাথার মধ্যে ফিল্মের মত চালাতে থাকেন – আর তারপর দুপুর আর বিকালের মধ্যবর্তী কোন এক সময়ে এসে তার স্মৃতি পূনর্ভ্রমনে হঠাৎ ছেদ পরে এবং তিনি ঘুমের সাগরে তলিয়ে যান। এই পূনর্ভ্রমন থেকে তিনি জীবন সম্পর্কিত কোন গূঢ় গাঢ় দর্শন বের করতে ব্যর্থ হোন। কারণ মীর কাশেম ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন, সাহিত্যের না।

Advertisements

কুঁচকুঁচে কালো পানির ক্যানাল – যার এক ইঞ্চি গভীরে থাকা জিনিসও উপর থেকে তাকালে দেখা যায় না, তাতে কোনভাবে স্পর্শ লাগলে চামড়া খসে পরে, আর প্রতিদিন দুপুরবেলায়ই মরা মাছ ভেসে থাকতে দেখা যায় – এর উপর দিয়ে চলে যাওয়া ব্রীজটা কংক্রিটের হলেও এ জায়গাটার নাম বাঁশেরপুলই; কারণ মীর কাশেম যখন বাহাত্তরে সালে সদ্যসমাপ্ত যুদ্ধের পর ঢাকার পলাশীর ভাড়া বাসা আর গুলিস্তান মার্কেটের ছোটখাটো চাকরী ছেড়ে ঢাকা আর নারায়নগঞ্জ – দুই শহরের মাঝখানে আটকে পরা – এই গ্রামীন এলাকায় প্রথম পা রেখেছিলেন আর জমানো টাকা দিয়ে যুদ্ধে ভিটাছাড়া মানুষের বেওয়ারিশ জমিগুলো নামমাত্র দামে কিনেছিলেন, আর অনেক বছর পর যখন তিনি প্রতি শুক্রবার সকালে এই ক্যানালে এসে গোসল করতেন একাএকা অথবা আরো অনেক বছর পর তার ছেলেকে নিয়ে, তখন ক্যানালের এপাশটার কাঁদামাটির পথ-ধানক্ষেতের আইল আর ওপাশের বড় রাস্তার একমাত্র সংযোগ ছিলো পাতাল করে ফেলা তিনটি বিশাল লম্বা বাঁশের একটা পুলই। আর এখন মীর কাশেম যখন শুক্রবার বিকেলে টং-এর দোকানে চা খেতে বসেন তার সমবয়সী অন্যান্য মধ্যবয়স্কদের সাথে, যাদের কারো কারো এই এলাকায় পদার্পন তার সাথেই, কারো কারো অনেক অনেক পরে, আবার যখন তিনি খাবার টেবিলে বা লোডশেডিং-এর রাতে দৈবাতে তার ছেলে-মেয়ের দেখা পান তখন তিনি মাঝে মাঝেই বাঁশের এই পুলের উপর ছিনতাইকারীদের মুখোমুখি হওয়া এবং পেটে ছুঁড়ি খাওয়ার ঘটনাটা বলেন। আর নিজের অজান্তেই তখন পেটের ডান-পাশটায় হাত চলে যায়। কখনো আবার প্রতি কাঠা মাত্র ছয় হাজার টাকা দিয়ে কেনা জমির গল্প বলেন। তখন তার ছেলে-মেয়েরা সেই গল্পে খুব একটা মনোযোগ দেয় না, বরং নিজেদের ত্রিশ-বত্রিশ হাজার টাকা দামের মোবাইলের পর্দাতেই তাদের চোখ আবদ্ধ থাকে। আর টং-এর দোকানে তার বাড়ির উপরের তলায় ভাড়া থাকা আলমগীর তার গল্পের শেষে অভিযোগ নিয়ে বলে, “কাশেম ভাই, ওয়াসার লাইনে তো পানি আসে না! একমাস ধইরা কষ্ট করতাসি, পানি টানাটানি করতে করতে জীবন চইলা গেলো। বামৈলের লাইনে শুনসি সারাদিন পানি থাকে, লাইন পাল্টান না কেন!” তখন মীর কাশেম প্রতি সকালে দোকানে যাওয়ার পথে বাঁশেরপুলের কংক্রিটের তৈরি ব্রীজটা পার হওয়ার সময় নিচের কালো-দূর্গন্ধময় পানির দিকে তাকান আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে্ন। অবশেষে যখন ভাড়াটিয়াদের অভিযোগ দিন দিন বাড়তে থাকে এবং নতুন বছরের আবির্ভাব ঘনিয়ে আসে তখন মীর কাশেম তার পকেটে হাত দিয়ে নোটের বান্ডিলের ঘনত্ব মাপেন এবং তার বাসার সামনের ওয়াসার লাইন পাল্টানোর পরিকল্পনা হাতে নেন।

পহেলা বৈশাখের বন্ধের দিন মীর কাশেম বাসায় থেকে কাজের দেখাশোনা করেন, রাস্তা খোড়াখুড়ি, পাইপের দৈর্ঘ্য মাপামাপি – অনেক কাজ। এসময় দুই হাতে দুইটি তরমুজ নিয়ে বাজার থেকে ফেরা আলমগীরের সাথে তার দেখা হয় এবং আলমগীর জিজ্ঞাস করে, “কী কাশেম ভাই, কী খবর!” মীর কাশেম সূক্ষ্ণ একটা হাসি দিয়ে বলেন, “খবর আর কী! ব্যবসার অবস্থা তো ভালো না। সব বিপদ একসাথে আইসে।” আলমগীর তার সাথে সহমত হয় এবং তার দূর্দশার সাথে একাত্বতা প্রকাশ করে দেশ, জনগণ আর সরকার নিয়ে গালাগালি শুরু করে। মীর কাশেম তখন ভাড়া চাওয়ার কথা তুলতে গিয়েও থেমে যান। সন্ধ্যাবেলা কাজ শেষ হলে তিনি যখন আরাম করার আয়োজন করেন তখন বাইরে থেকে একসাথে অনেকগুলো কর্কশ বাঁশির আওয়াজ ভেসে আসতে থাকে, তিনি জানতে পারেন এই জিনিসগুলোর নাম ভুভুজেলা এবং সুদূর আফ্রিকার মানুষের সাথে গায়ের রঙ ছাড়া আর সব সবদিক দিয়েই মিল খেতে ব্যর্থ হলেও অন্তত এই ব্যাপারটা বাঙালীর রক্তে মোটামুটি পাকাপোক্তভাবেই মিশে গেছে। মীর কাশেম তার ছোটবেলার এবং তার ছেলেমেয়েদের ছোটবেলার বৈশাখের কথা রোমন্থন করেন এবং একজন প্রাক্তন ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে বৈশাখের সাথে ভুভুজেলার নবীন ইতিহাস এবং এর দূরবর্তী ভবিষ্যতের গুরুত্ব নিয়ে চিন্তা করা শুরু করেন। কিন্তু অল্পতেই তার মাথা ব্যথা শুরু করে, কেবল শব্দের কারণেই না, অনেক কাল এধরনের চিন্তাভাবনা থেকে দূরে থাকার কারণেও, সারাদিন রোদের ঘোরাঘুরি করার কারণেও। তার সারাশরীরও ব্যাথা করতে থাকে।

এসময় আলমগীর আবার এসে তার বিশ্রামে বাঁধা দেয় আর জানায় যে কলে পানি নেই, তখন মীর কাশেম দেখেন যে এবার তার মোটর নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি আবার পকেটে হাত দেন, নোটের বান্ডিলের ঘনত্ব মাপেন এবং দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। তারপর জিজ্ঞেস করেন, “মাসের অর্ধেক তো গেলো গা। ভাড়া দেও না কেন!” সহসা এই প্রশ্নে আলমগীর অপ্রস্তুত হয়ে পরে এবং কোন জবাব না দিয়ে আমতা আমতা করে আর ঠিক তখন পেছনে সিঁড়ি দিয়ে তার ছেলে ভুভুজেলা বাজাতে উপরের তলায় উঠে যায়। নতুন মোটর লাগানোর পর মীর কাশেম যখন ঘরে ফিরেন তখন রাত বারোটা বাজে। এই সময়টায় মীর কাশেম উপলব্ধি করতে পা্রেন যে তাদের বাসায় ইঁদুরের উপদ্রব চরম মাত্রায় বেড়ে গেছে এবং তিনি একই সাথে তার শ্বাশুড়ীর বার্ধক্য সম্পর্কে অবগত হন, যখন তিনি দেখেন যে সে মীর কাশেমের সামনে দিয়ে হেঁটে গিয়েই পাশের রুমে খোঁজ করে, “বাবা, ভাত খাইতে আসো।” এবং এই ধারণা আরো ঘনীভুত হয় যখন খাবার টেবিলে মোমবাতির আলোয় বসে তিনি গল্প করেন যে রাতের বেলা তিনি ইঁদুরদের ডিশলাইনের তারের উপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে জানলা দিয়ে বাইরে চলে যেতে দেখেছেন। মীর কাশেম সারাদিনের ঘটনাপ্রবাহে প্রবল বিরক্ত হয়ে ভাত না খেয়েই ঘুমিয়ে পরেন। এবং আর যেকোন দিনের মতই স্বপ্ন দেখেন না।

কারণ তিনি অনেক কাল ধরেই স্বপ্ন দেখেন না। প্রতিদিন রাত দশটার পরপরই খাবার সেরে চাঁদর টেনে নেন। মীর কাশেম কোন একজায়গায় পড়েছিলেন, ঘুম হল বিড়ালের মত, একে উপেক্ষা করলেই বরং তাড়াতাড়ি কাছে আসে। কোথায় পড়েছেন তা অবশ্য রহস্যের ব্যাপার, কারণ তিনি বইপত্র তেমন পড়েন না, পত্রিকার প্রথম পাতাতেই তার দৈনন্দিন পাঠ্যাভাসের সমাপ্তী। একদিন রাতে তিনি শুয়ে শুয়ে স্মৃতির পাহাড় খুঁড়ে এই উক্তির অতীত বের করার চেষ্টা চালান এবং সেটাই হয় তার সেদিনকার ঘুমকে উপেক্ষার কৌশল। যথারীতিই এ রহস্য উদ্ধারের আগেই তিনি ঘুমিয়ে পরেন, এবং সকালে বিষয়টা বেমালুম ভুলে যান। আরো অনেকদিনের জন্য। কারণ মীর কাশেম ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন, ভূতত্বের না। আর বাকি বেশিরভাগ দিন তিনি মিনিট দুয়েক চোখ বন্ধ করে দিনের ঘটনাগুলো মাথার মধ্যে ফিল্মের মত চালাতে থাকেন – আর তারপর দুপুর আর বিকালের মধ্যবর্তী কোন এক সময়ে এসে তার স্মৃতি পূনর্ভ্রমনে হঠাৎ ছেদ পরে এবং তিনি ঘুমের সাগরে তলিয়ে যান। এই পূনর্ভ্রমন থেকে তিনি জীবন সম্পর্কিত কোন গূঢ় গাঢ় দর্শন বের করতে ব্যর্থ হোন। কারণ মীর কাশেম ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন, সাহিত্যের না। তিনি সারারাত এভাবেই ঘুমান, কোণ নড়াচড়াবিহীন, কোন বিরতিবিহীন, কোন স্বপ্নবিহীন। তার স্বপ্ন দেখার শেষটা অবশ্য হয়েছিলো যখন তার বাবা তাদের রেখে চলে গেল – তিনি তার ছোট ভাই এবং মাকে ঢাকায় নিয়ে আসলেন, এবং এসময় তার পড়ালেখার সমাপ্তী ঘটলো; যদিও পড়ালেখা তার কখনই ভালো লাগতো না, আর ইতিহাসের বইগুলো দেখলে মাথা ঘুরাতো। তিনি গুলিস্তান মার্কেটে কাজ করা শুরু করলেন – এখানকার লোকেরা জানলো যে তার বাবা মারা গেছে। এখন অনেক বছর পর যখন গুলিস্তান মার্কেটে তার নিজেরই একটা দোকান আছে, তখনও মীর কাশেম রাতের বেলা বাসায় অথবা বিকেলের ক্লান্ত রোদে দোকানে বসে দুপুরের খাবার খাওয়ার পর ঢুলতে ঢুলতে চোখ মুদে এলেও স্বপ্ন দেখেন না।

রাত একটায় এসে মীর কাশেমের গাঢ় ঘুমে ছেদ পরে। তিনি প্রথমে বুঝতে পারেন না কারণটা কী, কেবল চোখ না খুলেই জানালার গ্রিলগুলোকে প্রচন্ড শব্দে কাঁপতে শুনেন। তারপর ধীরে ধীরে সারাশরীর আর মাথার ব্যথা সহ্য করে দরজার সামনে এসে দেখেন তা খোলা এবং ঘরের সবাই তার আগেই বের হয়ে গেছে। তিনি এক মূহুর্ত পুরো ব্যাপারটা চিন্তা করেন, কম্পনের সমাপ্তীর জন্য অপেক্ষা করেন। তারপর অনিশ্চিত ভঙ্গিতে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে সেখানে একটা ভুভুজেলা পরে থাকতে দেখেন। মীর কাশেম সেদিকে তাকিয়ে আরো কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকেন, অবশেষে তা তুলে নিয়ে ঘরে ফিরে আসেন আর সোফায় বসে তা উলটে-পালটে দেখতে দেখতে বাইরে জড়ো হওয়া মানুষের জটলার চিৎকার চেঁচামেচি শুনতে থাকেন। পরের দিন, যেদিন ছিলো শুক্রবার, আর বিকেলে ছিলো প্রচন্ড রোদ, সেদিন টং-এর দোকানের চায়ের আসরে নিকট অতীতের ভূমিকম্পের আলোচনা, সাধারণ বর্তমানের রাজনৈতিক আলোচনা আর ঘটমান বর্তমানের গরমের আলোচনা শেষ হলে রফিক মিয়া ইঁদুরের প্রসঙ্গ তোলে এবং মীর কাশেম জানতে পারেন সমস্যাটা তার একারই না। “প্রতিদিন রাত্রে ইঁদুর মারনের ওষুধ দিয়া রাখি, শালার একটাও মরে না। খালি বড়ই হইতাসে। ইঁদুরের বাচ্চা ইঁদুর।” সিরাজুল ইসলাম ক্ষেদ প্রকাশ করে আর সবাই তখন সুসঙ্গতভাবে মাথা ঝাঁকায় আর সমস্বরে বলে, “হ! হ! ঠিক, ঠিক।” আর মীর কাশেম চিন্তা করেন, ইঁদুরকে ইঁদুরের বাচ্চা বলে গালি দিলে আদৌ সেটা গালি হয় কিনা। অন্তত এই দূর্দশার এলাকাব্যপী বিস্তৃত দেখে স্বস্তি পান। এসময় আলমগীর রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় ভেতরে উঁকি দেয় আর মীর কাশেমকে ভাড়ার কথা তোলার অবকাশ না দিয়েই দুই পাটির সবগুলো দাঁত বের করে দিয়ে হাসে আর বলে, “কাশেম ভাই, ইঁদুরের ব্যাপারে কিছু করেন না! বাড়িতে তো থাকা যায় না।” এই কথায় মীর কাশেমের সাময়িক আনন্দ আরো দীর্ঘায়িত হয় এবং তিনি মনে মনে ইঁদুরের আগমনকে সাধুবাদ জানান। আবার একই সময়ে সামগ্রিক ব্যাপার চিন্তা করে তার হাত অন্যমনস্কভাবে পকেটে নড়াচড়া করে এবং তিনি নোটের বান্ডিলের ঘনত্ব মাপেন কিন্তু অনেক ভেবেও ইঁদুর সমস্যা মোকাবেলার কোন উপায় খুঁজে পাননা।

সিরাজুল ইসলাম তার ঘন দাঁড়ি-মোচের ফাঁকে থাকা মুখে সিগারেটে লাগিয়ে তাতে টান টান দিতে দিতে মনীর সাহেবের মেয়ের বিয়ের খবর জানায় আর আলমগীর যখন জিজ্ঞেস করে, “ছেলে কী করে?” তখন সে পানের খিলি মুখে দিয়ে চাবাতে চাবাতে বলে, “ইউরোপ থাকে। চেকোস্লোভাকিয়া।”, আর এবার যখন মীর কাশেম জিজ্ঞেস করেন, “চেক প্রজাতন্ত্র না স্লোভাকিয়া?” তখন সে চায়ে চুমুক দিতে দিতে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “কী কইলেন?”, “এখন তো আর চেকোস্লোভাকিয়া নাই,” মীর কাশেম জানান, “চেক প্রজাতন্ত্র আর স্লোভাকিয়ায় ভাগ হইয়া গেসে।”, তখন সিরাজুল ইসলাম অনিশ্চিত ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে এবং মেনে নেয়, “তাইলে পরেরটাই, স্লোভাকিয়াই হইবো।” মীর কাশেমের মেনে নিতে কষ্ট হয় এবং সেদিন বাড়িতে ফিরে পুরো ব্যাপারটা আবার চিন্তা করেন। কিন্তু ভেবে কোন কিনারা করতে পারেন না, বাংলাদেশের মানুষ কেন চেকোস্লোভাকিয়া কিংবা চেক প্রজাতন্ত্র বা স্লোভাকিয়ায় যায়, আর তিনি কেন ১৯৯২ সালের এই ইতিহাস জানেন যেখানে এর বিশ বছরের আগেই তার ইতিহাস পড়ার পাঠ চুকে গিয়েছিলো। মীর কাশেমের অনেকদিন, অনেকরাত, অনেক মাস পর ঘুম আসতে কষ্ট হয়; তিনি ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে চিন্তা করতে থাকেন এবং এই সময় একটা বড়সড় ইঁদুরকে টেলিভিশনের পেছন থেকে বের হয়ে জানলা দিয়ে বের হয়ে যাওয়া ডিশের লাইনের তারটার উপর বসে থাকতে দেখেন। ইঁদুর জিজ্ঞেস করে, “এত কিছু কার জন্য করেন?” মীর কাশেম ইঁদুরের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন না, কারণ তিনি ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন, দর্শনের না, বরং পালটা প্রশ্ন করেন, “চেকোস্লোভাকিয়া ভাইঙ্গা গেসিলো কী জন্য?” ইঁদুরও তার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। এবং বিছানায় পাশে শুয়ে থাকা তার স্ত্রী প্রশ্ন করে, “এত রাত্রে কার লগে কথা কও?” মীর কাশেম এই প্রশ্নেরও উত্তর দিতে পারেন না, মাথা নাড়েন। “ঘুমায় পর, সকাল বেলা তোমার মেয়েরে স্কুলে দিয়া আসতে হইবো, পরীক্ষা আছে।” তারপর তার স্ত্রী যখন আবার ঘুমিয়ে যায় তখন মীর কাশেম আলমারীর উপর থেকে খুঁজে ভুভুজেলাটা বের করেন।

সেদিন রাত একটা বারো মিনিটে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় প্রচন্ড গরমে কিংবা ভুভুজেলার শব্দ শুনে এলাকার সব মানুষের ঘুম ভেঙ্গে যায় এবং তার দেখতে পায়, ঘর থেকে সব ইঁদুর সারি বেঁধে বের হয়ে যাচ্ছে। আমবশ্যার রাত বলে তারা বাইরে তাকিয়ে অন্ধকারে এই কর্কশ শব্দের কোন উৎস খুঁজে পায়না। কেবল নাইট গার্ড রমিজ বাঁশেরপুলের কংক্রীটের তৈরি ব্রীজের রেলিং উপর প্লাস্টিকের তৈরি ভুভুজেলা বাঁশি হাতে একজন মধ্যবয়স্ক মানুষকে বসে থাকতে দেখে। আর দেখে ব্রীজের পুরোটা জুড়ে ইঁদুর গিজ গিজ করছে এবং একে একে কিনারে এসে নিচের কালো পানিতে ঝাঁপ দিচ্ছে। মীর কাশেম ভুভুজেলা বাঁজাতে থাকেন, এবং একসময় তিনি দেখেন যে কেবল বড় ইঁদুরটাই বাকি আছে। “ঘুমাতে চলে যান,” ইঁদুর বলে, “সকালে না আপনার মেয়েকে দিয়ে আসতে হবে?” মীর কাশেম এর উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করেন, “স্বপ্ন কি ধার দেওন যায়?”, এবং এবারও ইঁদুর তার প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে না পেরে অথবা নীরব মধ্যরাতের বাতাশে প্রতিধ্বনিত হওয়া ভুভুজেলার শব্দ শুনে ব্রীজের কিনারে চলে গিয়ে নিচে ঝাঁপ দেয়।

মীর কাশেম সেদিকে তাকিয়ে থাকেন এবং তার মনে হয় নিচের কুঁচকুঁচে কালো পানির ক্যানাল – যার এক ইঞ্চি গভীরে থাকা জিনিসও উপর থেকে তাকালে দেখা যায় না – সেখানে হয়তো ভেসে থাকা মরা ইঁদুর আর ভেসে থাকা মরা মাছের পাশ দিয়ে ভুভুজেলা, চেকোস্লোভাকিয়া কিংবা বাঁশেরপুলের ইতিহাস, পাতিহাঁস আর রাজহাঁসেরা সাঁতার কাটে। আর অনেকদিন, অনেকরাত, অনেক মাস, অনেক বছর পর তিনি স্বপ্ন দেখেন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s