বর্ষা নিহারন

তাই শুক্রবার দুপুরের যখন সবাই সপ্তাহান্তের সমাগমে এই চরম অস্থিরতার নিরূপনে ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপের জন্য প্রার্থনা করল, তা যতটা না ছিল আত্নবিশ্বাসী চাওয়া তার থেকে বেশি ছিল মরিয়া, হাল ছেড়ে দেওয়ার আগের খড়কুটো আকড়ে ধরা শেষ ব্যগ্র কামনা। আর বাসায় ফেরার পথে আমি যখন দেখলাম টং-এর দোকানের প্লাস্টিক টেনে নামানো, আর রাস্তার বাঁ পাশের বাড়ির সামনেটা ফাঁকা, আর আমার অর্ধেক ফুল ইতিমধ্যেই মৃত – তখন শেষ আশার বর্তিকাটাও সেই কাল্পনিক বাতাসে নিভে গেল, যা বর্তমানে পরম আকাংখিত, অনুপস্থিত।

Advertisements

তারপর শুক্রবার সকালে শফিক, যে কিনা পাঁচ বছর মধ্যপ্রাচ্যে কাটিয়ে এসে গত শীতে মারা গেছে, ঘোষনা দিল যে সে তার জীবনে এত গরম দেখেনি, তখন আমরা সুসঙ্গতভাবে মাথা ঝাঁকালাম আর সমস্বরে বললাম, “ঠিক, ঠিক”, আর নিশ্চিত হলাম যা এতদিন ধরে আমরা অনুমান করে আসছিলাম;আসলেই এবছরের মত গরম ইতিহাসে আর কখনোই পরেনি। অবশ্য তার মতামতের জন্য অপেক্ষা করার কোন প্রয়োজন ছিল না, চারদিকে তাকালেই অন্য যেকোন বছরের সাথে পরিবর্তনটা খুব সহজেই ধরা পরে। রাস্তার বাঁ পাশের বাড়িটার সদর দরজার সামনের সিঁড়িতে দর্জির স্ত্রী আর মেয়ে এখন আর বসে থাকে না, যা তারা সবসময়ই থাকতো, প্রতিদিন;তা শীতের দুপুরে রোদ পোহাতেই হোক বা অন্যসব গরমের দিনের মধ্য-আর-অপর অহ্নের মর্ধ্যবর্তী স্থবির সময়টাতে টিনের ছাদের তাপ থেকে বাঁচতে, ৬৫ ডিগ্রি হেলে পরা সূর্যের ছায়ায়ই হোক। আর এখন বড়রাস্তার মোড়ের টং-এর চায়ের দোকানে অবসরে যাওয়া বুড়ো আর সাময়িক বিরতি নেওয়া রিক্সাচালকদের রাজনৈতিক আলাপ জমে ওঠে না। আর এখন আমার বাগানের ছাদে ফুলগুলো সব মৃত্যপ্রায়, তাদের উজ্জ্বলতা ম্রীয়মাণ, শুকনো পাতায় এমনকি মাঝে মাঝে সূর্যতাপে আগুন ধরে যায়। আর এখন দুপুরে বিছানায় এলিয়ে বই পড়তে পড়তে দুই পাতা পরই ঘুমিয়ে গেলেও মিনিটখানেক পরেই ঘামেভেজা জামা নিয়ে ঘুম ভেঙ্গে যায়। কোন স্বপ্ন দেখার সময় পাইনা। কোন দুঃস্বপ্ন দেখার সময় পাইনা। কতদিন ধরে এরকম চলছে তাও গুনে কুল পাইনা।

তাই শুক্রবার দুপুরের যখন সবাই সপ্তাহান্তের সমাগমে এই চরম অস্থিরতার নিরূপনে ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপের জন্য প্রার্থনা করল, তা যতটা না ছিল আত্নবিশ্বাসী চাওয়া তার থেকে বেশি ছিল মরিয়া, হাল ছেড়ে দেওয়ার আগের খড়কুটো আকড়ে ধরা শেষ ব্যগ্র কামনা। আর বাসায়  ফেরার পথে আমি যখন দেখলাম টং-এর দোকানের প্লাস্টিক টেনে নামানো, আর রাস্তার বাঁ পাশের বাড়ির সামনেটা ফাঁকা, আর আমার অর্ধেক ফুল ইতিমধ্যেই মৃত – তখন শেষ আশার বর্তিকাটাও সেই কাল্পনিক বাতাসে নিভে গেল, যা বর্তমানে পরম আকাংখিত, অনুপস্থিত।

আর আমি খাবার খেয়ে শুয়ে পড়ে বিভুতিভুষনের বইটা টেনে নিলাম, গত একমাসে যার গল্পের দিক, গতিবিধি নির্ণয় করতে ব্যর্থ আমি পৃষ্ঠা দশেক শেষ করতে পেরেছি মাত্র। আজো দুপৃষ্টা পড়তেই আমার চোখের পাতার সাথে যেন কেউ জাফলং সীমান্তের পাহাড়ের ওপর থাকা বড় বড় শ্বেতপাথরগুলো টাঙ্গিয়ে দিল। কখন ঘুমিয়ে গেছি টের পাইনি, কিন্তু যখন ঘুম ভাঙ্গলো তখন আমার গা সম্পূর্ণ শুষ্ক আর চোখে ঘুমের কোন অসম্পূর্ণতা লেগে নেই। আরেকটা জিনিস খুব সহজেই আঁচ করতে পারলাম, পরিবেশটা অনেক কোলাহলপূর্ণ, শীতল, প্রায়ান্ধকার আর আনার্দ্র। দ্রুত বিছানা ছেড়ে দুদিকের টেনে দেওয়া জানালারে পর্দাগুলো সড়ালাম। বাইরে তাকিয়ে বেশ অবাক হলাম। আকাশে সূর্যের কোন চিহ্ন নেই, তবে এখনো সন্ধ্যা হয়নি, মেঘে ঢাকা পুরো আকাশ, কালো মেঘ। পেজা তুলোর মত কালো মেঘ। নিচে চারদিকে মানুষের ছুটোছুটি, আর গাছের ডালে, পাতায় পাতায় অদৃশ্য কিন্তু অবশ্যই উপস্থিত…বাস্তব বাতাসের আনাগোনা।

বলতে বলতেই ঝরঝর করতে বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। প্রথমে ধীরে ধীরে এক-দু ফোঁটা, ছোট ছোট। তারপর একসাথে মোটা, বর্ষার ফলার মত, মাটিতে ক্ষত সৃষ্টি করে যাওয়া, ঝিমিয়ে পড়া পাতাগুলোকে জাগিয়ে দেওয়া আর জমে থাকা নোংরা, কালো পানির ডোবাটায় আলোড়ন তোলা – বৃষ্টি।

আমি  নেমে এলাম একতলা আর দু’তলার মাঝখানের সিঁড়ির বারান্দাটায়। মার্বেল পাথরের মেঝে, কোমড়সমান রেইলিং আর উপরে চাঁচের ছাদ টানা। বৃষ্টির শব্দ শূনবো বলে। কিন্তু টিনের ছাদে বৃষ্টি পরার শব্দ যতটা শ্রুতিমধুর আর স্মৃতিবেদনাতুর, এখানে তা ততটাই কর্কশ আর বিরক্তিকর। তাই প্রথমে আলমারির উপর থেকে খুঁজে এক শিক ভাঙা ছাতাটা নামালাম। তারপর নেমে গেলাম রাস্তায়, প্রাথমিক উচ্ছ্বাস আর উৎসবের পর যা বর্তমানে অনেকটাই ফাঁকা আর নীরব। আর কর্দমাক্ত। আর পিচ্ছিল।রাস্তা ঘুরে ঘুরে টিনের ছাদের একটা বাসা খোঁজার চেষ্টা করলাম। কিন্তু গত সপ্তাহেও যে বাসাটা দাঁড়িয়েছিল, টিনের ছাদ আর ইটের দেয়াল নিয়ে তা আজ ধ্বংসস্তুপ, ইমারত হুওয়ার অপেক্ষায়। কংকালের মত দেওয়ালগুলো দাঁড়িয়ে আছে, উপরে ছাদ নেই, দরজা-জানালা জায়গাগুলো ফাঁকা। এগিয়ে গেলাম। দর্জিদের বাড়িটার উঠোন পেরনো ফটক বন্ধ, আর বৃষ্টির শব্দ শোনার বায়নায় তা খুলিয়ে ভেতরে ঢুকে পাগল উপাধি পাওয়ার ইচ্ছা নিবারন করলাম। আরো আধা ঘন্টা উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরির পর, কাদামাখা প্যান্ট আর বৃষ্টির ঝাঁপটায় ভিজে গায়ে লেপ্টে থাকা শার্ট নিয়ে যখন বাড়ি ফিরলাম, তখন দেখি বিদ্যুৎ নেই। অগত্যা জামা পালটে চাঁচের ছাদের বারান্দার নিচে বসেই বৃষ্টি দেখতে থাকলাম, মরা বিকেলের রোদে।

সন্ধ্যাবেলাও বৃষ্টির বেগ এতোটুকু কমলো না। বরং বাড়লো আরো। বিদ্যুৎহীন রাতের অন্ধকারও। আমি মোমবাতির কাঁপা কাঁপা আলোয় বিভুতিভুষনের উপন্যাস প্রায় অর্ধেক শেষ করে ফেললাম।

শনিবারে সকালে উঠে দেখলাম বৃষ্টি একই বেগে পরছে;এখনো অদম্য তবে আরো বেশি বিষাদগ্রস্থ। আমার বাগানের ফুলগুলো সজাগ্রত কিন্তু আরো বেশি রঙহীন। দুপুরে খিচুড়ি চড়ালাম। বর্ষাদুপুরে এর থেকে ভালো আর কী হতে পারতো। তারপর বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম, কোন বইয়ের দরকার পরল না, নির্ঘুম সব দুপুরের ঘুমগুলো যেন দুপুরের অগোচর চাঁদের আকর্ষনে সুউচ্চ ঢেউয়ের ঝাপ্টায় এসে আমাকে মগ্ন করে গেল। সন্ধ্যার গ্লানিযুক্ত, জাপটে ধরা, নিস্তব্ধ অন্ধকারে যখন উঠলাম তখন দেখি সন্দীপন বিছানার পাশে বসে আছে।  সন্দীপনের বিছানার পাশে বসে থাকার কথা না, তার থাকার কথা বঙ্গোপসাগরে। পানির নিচে। কিন্তু সে বিছানার পাশেই বসে আছে, আর তার হাতে বেশ বড় একটা ইলিশ মাছ। মুখে কান পর্যন্ত ছড়ানো হাসি।

আমি রান্নাঘরে গিয়ে বসলাম, সন্দীপন দূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার সমুদ্রযাত্রার গল্প বলা শূরু করল। গত পাঁচ বছরে তার পাড়ি দেওয়া হাজারো শহর-বন্দর আর দূরদ্বীপের গল্প। জলদস্যুদের গল্প। আর গুপ্তধনের গল্প। আর ব্ল্যাকবীয়ার্ডের সাথে তার সাক্ষাতের গল্প। আমি একমনে কাজ করে যাই, আর তার গল্প শুনি। যেন আনেকদিন কারো সাথে কথা হয়না।

“কদিন থাকতে এলে এবার?” খাবার টেবিলে আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি। কোন জবাব না পেয়ে আমি দেখি মোমবাতির ওপাশে বিপরীত দিকের চেয়ার শূন্য, সামনে টেবিলে খালি, পরিষ্কার থালা। জানালার কাঁচে বৃষ্টির আঘাত আগের মতই জোড়ালো। তার ফাঁক দিয়ে যা একটু বাতাস আসছে, তাতে কম্পমান আগুনের নর্তন;আমার চোখে ধাঁধাঁ লাগায়। একমনে মাথা নিচু করে খেয়ে যাই।

রবিবার বৃষ্টির পানি নিচের কলাপসিবল গেটের ফাঁক দিয়ে ভেতরের সিঁড়ির গোড়ায় চলে আসলো। বাইরের রাস্তায় হইচই শুনে বেরিয়ে গেলাম দুপুরে। দেখি দর্জিদের বাড়ির সামনে ভিড়। কারো হাতে ছাতা, কারো হাতে নেই। কিন্তু সবার জামাই হাঁটু পর্যন্ত টেনে তোলা। শফিকের সাথে দরজার সামনে দেখা হয়ে গেল। সে আমাকে দেখে হাসিমুখ আর ষড়যন্ত্রী দৃষ্টি নিয়ে সন্তর্পনে এগিয়ে এল। দর্জির মেয়ে নাকি দুপুর বেলা একা একা বেরিয়েছিল ভাজা খাবার খেয়ে। আজ পুজার দিন। প্রেতাত্মাদের ঘুড়ে বেড়ানোরও। আর সেরকমই কোন একটা তার ঘাড়ে চেপে বসেছে। ভিড় ঠেলে ভেতরে গিয়ে দেখি মেয়েটার ঘাড় একদিকে কাঁত করা। মুখ ফ্যাকাশে। চোখ ঘোলা ঘোলা, ঘোরের মধ্যে যেন। বয়স কত? আট-দশ? ওঝা আনতে খবর দেওয়া হয়েছে। আমি বাড়ি ফিরে এলাম। সন্ধ্যায় যখন আজান দেওয়া হয়, তার সাথে সাথে হঠাৎ একযোগে অনেকগুলো কান্নার শব্দও ভেসে এলো। আমি অন্ধকারে চুপচাপ বসে থাকি।

সোমবার সকালে দেখি পানি এক তলা ছাড়িয়ে আমার বারান্দায় উঠে গেছে। শফিক এসে খবর দিল দলে দলে লোকেরা এলাকা ছাড়া শুরু করেছে, নৌকা নামানো হয়েছে, আমি যেতে চাই কিনা। আমি মাথা নাড়লাম।

মঙ্গলবার আরো একটা পরিবর্তন দেখলাম, কাঠের দরজাগুলোর ফুলে ফেঁপে এমন অবস্থা যে ছিটকানি না লাগালেও তার মত শক্ত হয়ে আটকে থাকে, সজোড়ে না ধাক্কালে খুলে না। অবশ্য তার কোন প্রয়োজনও ছিল না। সেদিন সন্ধ্যায় আর আজানের শব্দ শোনা গেল না। অন্ধকার যতই হোক আজকের মত ভুতড়ে রাত আর কখনো লাগেনি। যে দুটো মোমবাতি বাকি ছিলো তা জ্বালিয়ে শেষ করলাম। তারপর শুধুই চাঁদের আলোর অকৃত্রিমতা। ঝিঁঝিঁপোকার ডাক। তারা কোথায় ভেসে আছে কে জানে।

পরের দিন চোখ খুলে সাথে সাথে বন্ধ করে দিতে হল। অন্ধ করে দেওয়া উজ্জ্বলতা চারিদিকে, দেওয়ালে দেওয়ালে কম্পমান রংধনু। খোলা জানলায় দিয়ে তাকিয়ে দেখি সূর্য দেখা যাচ্ছে, আকাশে মেঘের কোন চিহ্ন নেই। তবে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি এখনো পরছে। মেঝেতে পানি, বাইরের যতদুর চোখ যায় সবদিকে পানি। আর তার মাঝে অনেক বিশাল ভাসমান এক সোনার থালার মত সূর্যের প্রতিবিম্ব, কাঁপা কাঁপা। দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে একটা প্লাস্টিকের চাঁদরের মাথা ঢূকে আছে। ইতিমধ্যে ডুবে যাওয়া চায়ের দোকানটারই হয়তো। অনেক কায়দা কসরত করে দরজাটা খুলতে হল, লাগানোর আর প্রয়োজন মনে করলাম না। লাশের গন্ধ আসছে। কবরস্থানের নতুন কবরগুলোতে থাকা হিমশীতল দেহগুলো, দূর দূর থেকে জড়ো হওয়া, আবার সাদা  ভেলার মত ভেসে চারদিকে ছড়িয়ে পরছে। ভেসে বেড়াচ্ছে। একটা কাগজের মালা দিয়ে সাজানো নৌকাও, তাতে একপাল শিয়াল। আর আমার ঘরের একোন-ওকোনে অতীত ভূতগুলো। আমি কী করব ভেবে পাইনা।

রাতে ছাদে উঠলাম, আধো আধারে দেখি বাগানের টবগুলো পানিপূর্ণ, তার ভেতরের মাটি কাদা হয়ে চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে, গাছগুলো শিকড়ছাড়া। অনেকদিন পর তারা দেখি, ছোটবেলার মত। উপরে আকাশে, যতদুর চোখ যায়, ক্যামেলাপারদালিস তার সুউচ্চ জিরাফের গলা নিয়ে দাঁড়িয়ে, তার সকল জীবিত আর নিহত নক্ষত্রগুলো, নিচে পানিতে তার প্রতিবিম্ব, যতদুর চোখ যায়। স্বচ্ছ কাঁচের মত, শুধু তাতে বৃষ্টির ফোঁটার যোগ।

রাত গভীর হলে বিছানা জবুথুবু হয়ে শূয়ে থাকলাম, আবছাভাবে দেখলাম এক কোনায় কালো একটা সাপ দলা পাকানো। অস্বস্তি নিয়ে ঘুমাতে গেলাম। মধ্যরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেল, দেখি সে নেশার্ত কন্ঠে গান গেয়ে যাচ্ছে। ~ আধেক ঘুমে নয়ন চুমে স্বপন দিয়ে যায় ~বেশিক্ষন শুনতে পারি না, আমার ঘুম পূর্ণতাপ্রার্থী। তাই আমি কোন স্বপ্নও দেখি না। তাই আমি কোন দুঃস্বপ্নও দেখি না।

পরের দিন পানি দোতলাও গ্রাস করে ফেলল। ছাদে বসে থাকলাম সারাদিন, কাকভেজা হয়ে। আশেপাশের ছাদগুলোতে তাকিয়ে দেখি, কেউ উঠে আসে না। মাঝে মাঝে ছাদের কিনারায় বসে পা নামিয়ে দেই। নিচে মাছদের দেখি, আমার ঘরের বইগুলো জানলা দিয়ে বের হয়ে যাওয়া আর তারপর ধীরে ধীরে তাদের তলিয়ে যাওয়া দেখি। আকাশ আবার সূর্যকে গিলে ফেলেছে। দিনের বেলা মেঘ ছাড়া আর কিছু চোখে পরে না। রাত আর দিনের তফাৎ করা দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানব উৎপাদিত বিদ্যুতের অভাবেই হয়তো একদিন রাতে আকাশ থেকে তা পরা শুরু করল। চারদিক এমন আলোকিত হল, সেদিন দিনের বেলাও ততটা আলো ছিল না। বৃষ্টির বেগও ক্রম উর্ধমুখী। বড় বড় ফোটা, হাতুড়ির মাথার মত, সিমেন্টে ক্ষত সৃষ্টি করে যাওয়া, চারদিকের পানিতে বুদবুদ সৃষ্টি করা, আমার নতজানু মাথার চুলগুলোকে উপরে ফেলা – বৃষ্টি। কতদিন, কতরাত ধরে এরকম চলছে তার কুল পাইনা।

একদিন রাতে সন্দীপন ফিরে আসলো, দেখি তার হাতে আরেকটি ছোট হাত আকড়ানো। দর্জির ছোট মেয়ে। ঘাড় একদিকে কাঁত করা। সন্দীপন তাঁর জলযাত্রার গল্প শুরু করল। টাইটানিক ডোবার গল্প। আর ২০০৪ এর সুনামির গল্প। আর মোবি ডিকের সাথে সাক্ষাতের গল্প। পেছনে ঝিঁঝিঁপোকাদের ডাক, মৃতদেহগুলোর খুলিতে হয়তো আবাস গেড়েছে। আর আমার দোমড়ানো মোচরানো, শিকড় উপড়ানো সর্পগন্ধা ফুলের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে।

আর তারপর যখন সন্দীপন, যে কিনা দশ বছর ধরে জাহাজে জাহাজে ঘুরে বেড়িয়েছে এবং বছর পাঁচেক আগে বঙ্গোপসাগরে তলে মাছেদের খাবার হয়েছে, ঘোষনা দিল যে সে তার জীবনে এতো পানি দেখেনি, তখন চারদিকের ভেসে বেড়ানো লাশগুলো থেকে হাজারো ভূতেরা এসে জড়ো হয়ে সুসঙ্গতভাবে মাথা ঝাঁকালো আর সমস্বরে বলল, “ঠিক ঠিক”, তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আজ কি শুক্রবার?”


	

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s