চন্দ্রাহত, ঘাসের উপর; চন্দ্রাহত, ঘাসের উপর

আমি এক লাইন-দু লাইন এগুতে চেষ্টা করি। কিন্তু ঘাস আর লতাপাতা এসে গলার কাছে জড়িয়ে যায়, কানের ভেতর ঢুকে পরে। তার থেকে হঠাৎ হঠাৎ গানের সুর ভেসে আসে। খুব পরিচিত, কিন্তু নামটা মনে করতে পারি না। না-উপস্থিত কেউ কেউ এসে কানের কাছে ফিসফিস করে কথা বলে যায়।

“ধার করা গল্প দিয়ে আর ক’দিন?” সেখান থেকে উডি অ্যালেন বলে।

“গল্পের একটা নাম তো দেওয়া দরকার এখন,” মুরকামির গলা ভেসে আসে। “নিশ্চয় কোন গানের নামে হবে!”

Advertisements

“একটা গল্প লিখতে চাই,” ঠিক স্বগতোক্তি নয়, অনেকটা জোরেই বলে ঊঠি। চায়ের দোকানের বাইরে বজ্রপাতের শব্দ। কিন্তু বৃষ্টি পরতে দেখলাম না। একপাশের কাঠের বেঞ্চে আমি বসা, সামনের দিকে নতজানু হয়ে থাকা, কিছুটা ঠান্ডা বাতাসের থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টায়, কিছুটা সেই শীতের প্রকোপে নিজের সৃজনশীলতার পুকুরের জলাভাবের কথা উপলব্ধি করতে পারায়।
“আমার কাছে গল্পের অভাব নেই, ধার নেবে নাকি?” অনিমেষ বলল বেশ গর্বের সাথে, তার দুই হাত আড়াআড়িভাবে বুকের কাছে আটকানো, সুন্দর ভাঁজহীন পাঞ্জাবীটার উপর, আমার মত জরাজীর্ণ টি-শার্ট না। তাকে দেখলে আসলেই সাহিত্যিক মনে হয়। তারপর নিজের নাকের খাঁজে থাকা মোটা ফ্রেমের চশমাটা সাবধানে আটকে, আরেক হাত দিয়ে সে মাথার উপরটা টান দিয়ে খুলে দেখালো। আসলেই তার মাথায় অনেক গল্প গিজগিজ করছে। ছোট ছোট পোকামাকড়ের মত, একটার উপরে আরেকটা, আঠালো দেহ থেকে সাহিত্যরস গড়িয়ে পরছে। একবার কিলবিল করে উঠছে, আবার পিছলে পরে যাচ্ছে। অনুমিতই – অনিমেষের দেয়াল ভর্তি নাকি সাহিত্য পুরস্কার, জাতীয়-আন্তর্জাতিক, নোবেল পাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। যদিও আমাদের কখনো ওর বাসায় নিয়ে যায়নি।
“কিন্তু আমি তো তোমার গল্প লিখতে চাই না,” আমি তবুও সন্তুষ্ট হই না। মাথা নাড়ি। থুতনির কাছের দাড়িটার উপর আঙ্গুল চালাই। হঠাৎ ঠান্ডা বাতাসে আরো কিছুটা গুঁজো হয়ে বসি। দীর্ঘশ্বাস ফেলি। “নিজের কাছে যে গল্প নেই এমনটা না। দুটো গল্প অর্ধেক লিখে বসে আছি, শেষ করতে পারছি না।”
“খাতা কলম নিয়ে ঘর বন্ধ করে পরে থাকো।” সুদীপ্ত পায়ের উপর পা দিয়ে বসে ছিল, দু’হাতে খবরের কাগজ পুরোটা ছড়িয়ে ধরে। আমার দিকে না তাকিয়েই কথাগুলো বলে।
“সবকিছু বাদ দিয়ে পরে থাকা সম্ভব নাকি!”
“আন্তরিকতা না থাকলে লেখালেখি হবে না। ভেবেছো কী! মাথার মধ্যে গল্প আসবে আর বসে একটানে পুরোটা লিখে ফেলবে?”
আমি আসলেই ব্যাপারটা ভেবে দেখি। অন্য কিছুতে মনোযোগ দেওয়া দরকার, অনেক তো হল।
“কিন্তু আসলেই অসমাপ্ত রেখে দিলে একটা অস্বস্তি কাজ করে সবসময়।”
“তাহলে গল্প লিখতে না পারা নিয়ে একটা গল্প লিখো,” অনিমেষ বলে। “দারুণ হবে!”
আমি তার দিকে অনিশ্চয়তা নিয়ে তাকালাম।
“এর থেকে লোক দেখানো জিনিস আর হয় না,” সুদীপ্ত বিরক্তি প্রকাশ করলো। “প্রিটেনশাস! কেউ পড়বে না।”
আমি তার দিকেও তাকাই, অনিশ্চয়তা আর অস্বস্তি নিয়ে।
“মানুষ যা বুঝে না তাকেই প্রিটেনশাস বলে,” অনিমেষও জোর দিয়ে বলল। “লোক দেখানো না, লোক দেখানো না। এটা হবে পোস্ট-মডার্নিজম। সমালোচকরা লুফে নিবে। সেলফ-কনশাস ন্যারেটিভে লিখবে। তারপর তোমার পুরান কোন গল্পের সাথে একটা যোগ লাগিয়ে দিবে।”
“এত কঠিন জিনিস সম্ভব না। তোমার মত তো লিটারেরী থিওরিতেও আমার জ্ঞান নেই।” আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি।
“ঐ হলো। সবকিছু পড়া থাকা লাগবে কেন? ধারণা থাকলেই তো হয়,” অনিমেষ চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে বললো। “ফিকশন লেখকরা যা নিয়ে লেখে তার সববিষয়ে তারা বিশেষজ্ঞ নাকি! একটা কিছু পড়ে ভাবছো, এই বিষয়ে তার কত জ্ঞান। আসলে বইয়ে যতদূর লেখা আছে দৌড় ঐ পর্যন্তই।”
সুদীপ্ত এতক্ষন চুপচাপ ছিলো, অনিমেষ থামতেই সে শুরু করলো, “একটা শেষ করতে পারছো না, নতুন গল্প শুরু করার কি দরকার। আগেরটা নিয়েই চেষ্টা কর। সবচেয়ে ভালো হয় ওপেন-এন্ডেড একটা এন্ডিং দিয়ে দাও। হঠাৎ করে শেষ করে দিবে। লেফট টু রিডার’স ইন্টারপ্রেটেশন। পাঠকরা পড়বে, কিছু বুঝবে না, ভাববে কিছু হয়তো মাঝখানে লক্ষ্য করতে ভুলে গেছে। আবার পড়বে, বারবার পড়বে। তারপর একসময় তাদের ভালো লেগে যাবে, কেন ভালো লেগেছে তা তারা নিজেরাও বলতে পারবে না।”
“আমার মতে তোমার গল্পে একটা কথা বলা প্রাণী থাকা দরকার,” উপরের ৪০ ওয়াট বাল্বের নিচে ঝুলে থাকা টিকটিকিটা বলে ঊঠলো। যদিও তার মুখ নড়লো না। “এটা হবে তোমার ভেতর-স্বত্ত্বার ম্যানিফেস্টেশন।” আশেপাশে একটা প্রজাপতি উড়তে থাকায়, তার মনোযোগ বেশিক্ষন এদিকে থাকলো না।
অস্বস্তি আর অনিশ্চয়তা দেয়ালের পিঁপড়াগুলোর সাথে যোগ দিয়ে চামড়ার ভেতর দিয়ে কুটকুট করে হেঁটে বেড়াতে শুরু করে। তারপর মাথা পর্যন্ত উঠে যায়, চোখের ভেতর ঢুকে যায়। তার কারণেই হয়তো বা, অথবা সুদীপ্তর মুখ আর নাক দিয়ে বের হওয়া সাদা ধোঁয়ার গন্ধের কারণে, কপালের সামনেটায় আর চোখে ব্যথা ধরা শুরু করে। কিছুটা দূরে সরে দাঁড়াই। চশমাটা খুলে ফেলে, আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি; লক্ষ লক্ষ মাইল দূরের চাঁদের আলো দিকে, মেঘ আর ধুলোবালির প্রাচীর ভেদ করে আসায় যা অনেক বেশি ম্রীয়মাণ, আমি তাকিয়ে থাকি সামনের দশ তলা বাসার নবম তলায় কোনার ঘরে জ্বলতে থাকা বাতির দিকে, আমার ফুলে যাওয়া অক্ষিগোলকের কারণে আয়নার প্রতিবিম্বের মত দুপাশে সরে গিয়ে যা দুটো দেখায়, ঘোলাটে আর অস্পষ্টও, অথবা আমি হয়তো তাকিয়ে থাকি আমার তিন গজ দূরের অন্ধকার শুন্যতার দিকে, কারণ চশমা ছাড়া ততদূর পর্যন্তই সর্বোচ্চ আমি তাকিয়ে থাকতে পারি।
আসলেই আমি অন্ধকারে তাকিয়ে আছি। নিজের ঘরে। জানালায় টোকা দিচ্ছে কেউ। খুলে দেখি বাইরে আশরীরসিক্ত বিভুতিভূষণের অবয়ব দাঁড়ানো। তার চেহারাটা কীরকম? তার কী বড় বড় দাঁড়ি আছে? অথবা নাকের নিচে গোঁফ? মনে করতে পা্রি না। বৃষ্টিও কি তাহলে আসলেই হয়েছে?
“কী, হে, শুনলাম তুমি নাকি গল্প লিখার চেষ্টা করছো?” তিনি আমার কাঁধের উপর দিয়ে ভেতরে উঁকি দিলেন।
আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম, “এই তো প্রায় শেষ বলে।”
তিনি আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলেন। তারপর নিজে থেকেই টেবিলে উপর স্তুপ হয়ে থাকা কাগজ-পত্র উল্টাতে উল্টাতে, আর মাথা নাড়াতে নাড়াতে, গলায় প্রচন্ড বিরক্তি এনে বললেন, “ছাইপাঁশ। একে সাহিত্য বলে! বাইরের চাকচিক্যই আছে কেবল, ভেতরে একদম ফাঁকা। উল্টাপাল্টা কাহিনী লিখে তা ড্রিম লজিক দিয়ে চালিয়ে দিলেই হয় নাকি?”
আসলেই তো। আমি হাল ছেড়ে দেই, বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে পরে থাকি। কপালের উপর হাতের উলটো দিকের স্পর্শ পাই, আমার কিংবা অন্য কারো। প্রচন্ড গরম।
স্কুলের বাংলা ক্লাসের হাবিব স্যার চেঁচিয়ে উঠেন, “একশো তিন!”
আমি ইয়েস স্যার বলার চেষ্টা করি, কিন্তু মুখের কাছে এসে শব্দগুলো জড়িয়ে যায়।
আর তারপর যখন সন্দীপন, যে কিনা দশ বছর ধরে জাহাজে জাহাজে ঘুরে বেড়িয়েছে এবং বছর পাঁচেক আগে বঙ্গোপসাগরে তলে মাছেদের খাবার হয়েছে, মুখের বাতাস দিয়ে সামনে কুয়াশা হয়ে জমে থাকা ধোঁয়া উড়িয়ে দিয়ে বললো, “তোমার উচিৎ ছিলো মাস-মাস ধরে চলা বর্ষার কাহিনীতেই পরে থাকা, শীতের গল্প তোমায় দিয়ে হবে না”; তখন মাথার উপর পানি জমে থাকা ভেজা ঘাসগুলো আর ঘরের কোনে চুপচাপ বসে থাকা টিকটিকিটা সুসঙ্গতভাবে মাথা ঝাঁকালো আর সমস্বরে বলল, “টিক টিক”, আর আমি কী বলবো ভেবে না পেয়ে চুপ করে থাকি; কারণ আজ তো শুক্রবার না, বরং জবুথুবু হয়ে উঠে বসতে গিয়ে শিশির অথবা বৃষ্টি অথবা দুটোতেই ভিজে থাকা ঘাসের মাটিতে পা দিতেই প্রচন্ড ঠান্ডায় কেঁপে উঠি, আর মনে হয় – মা বাসায় থাকলে নিশ্চিত বিছানার পাশে একটা স্যান্ডেল এনে রেখে যেত।
“অনেক তো লিখলে, এবার থামো,” ঘাসের উপর বসে আমার না পাওয়া ভবিষ্যৎ সব সাহিত্য পুরস্কার আগুনে পুড়িয়ে তাতে তা দিতে দিতে, ডান হাতের দুই আঙ্গুল দিয়ে নিজের লম্বা গোফের কোনা মুচড়ে মার্কেজ বললো। “এভাবে অগোছালো আখ্যানে গল্প লিখলেই হলো নাকি? এক বাক্য দিয়ে ছয় পৃষ্টার গল্প লিখে দেখাও দেখি, স্ট্রিম-অফ-কনশাসনেস এর আয়ত্ব কতদূর পরীক্ষা হবে।”
আমি এক লাইন-দু লাইন এগুতে চেষ্টা করি। কিন্তু ঘাস আর লতাপাতা এসে গলার কাছে জড়িয়ে যায়, কানের ভেতর ঢুকে পরে। তার থেকে হঠাৎ হঠাৎ গানের সুর ভেসে আসে। খুব পরিচিত, কিন্তু নামটা মনে করতে পারি না। না-উপস্থিত কেউ কেউ এসে কানের কাছে ফিসফিস করে কথা বলে যায়।
“ধার করা গল্প দিয়ে আর ক’দিন?” সেখান থেকে উডি অ্যালেন বলে।
“গল্পের একটা নাম তো দেওয়া দরকার এখন,” মুরকামির গলা ভেসে আসে। “নিশ্চয় কোন গানের নামে হবে!”
আমি সেই মনে করতে না পারা গানের পরিচিত সুর গুনগুন করতে করতে, চোখ বন্ধ আর খোলা রাখার খেলা খেলতে খেলতে, মাতালের মত দুলতে দুলতে, ভেক্টরের ত্রিভুজ সূত্র মেনে আমার সৃজনশীলতার পুকুর পারের দিকে এগিয়ে যাই। নিচের স্বচ্ছ কিন্তু প্রায় শুকিয়ে যাওয়া জলের স্তুপের দিকে তাকাই। পানি কি একটু বেড়েছে? বৃষ্টি কি তাহলে আসলেই হয়েছে?
চশমা ছাড়া নিজের প্রতিবিম্বও দুটো দেখায়। আমি খুব ধীরে ডান হাতটা উঠিয়ে মাথার উপর দিকটা খুলে ফেলি। দেখি সেখানে তিনটে গল্প গুটিশুটি হয়ে পরে আছে, অনিমেষেরগুলোর মত পরিপক্ক না। ছোট ছোট ধরগুলোর পাশে হাত-পা অনুপস্থিত। কদর্য আর অসমাপ্ত।
আমি একবার চিন্তা করি। হাতের আঙ্গুল দিয়ে গুণে দেখি, একবার, দুবার, তিনবার।
আগে কি দুটো ছিলো না?

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s